কোবেঃ লিঙ্গবিকৃতির বলি
কোবে একজন ট্রান্সনারী বা রূপান্তরিত নারী, যে আগে ছিল একজন সুস্থ স্বাভাবিক পুরুষ।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন তার বয়স ১১ বছর। ছোটবেলা থেকেই দেখতে সুন্দর ছিল, গোলাপি রঙ পছন্দ করতো, মেয়েদের মতো পুতুল খেলতে ভালবাসতো। তাই স্কুলে সবাই তাকে ক্ষ্যাপাতো। একসময় সে নিজেও ভাবতে শুরু করলো তার হয়তো মেয়ে হওয়ারই কথা ছিল। এর মধ্যেই বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত হলে সে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা শুরু করে। বিষয়টা তাকে মানসিকভাবে ভীষণ অস্থির করে তোলে, কারণ এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে সে নিজেকে নিয়ে বিষন্ন থাকতো এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে থাকে। একদিন গভীর রাতে নেট সারফিং এর সময় সে জানতে পারে ট্রান্সজেন্ডার বিষয়ে। একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে সে প্রভাবিত হয়।
কোবে ভাবতে থাকে অপারেশনের মাধ্যমে যদি সে নিজের পুরুষাঙ্গ ফেলে দেয় ও মেয়েতে রুপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তাহলে তাকে আর সমকামিতা নিয়ে বিব্রত হতে হবে না, সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাবে সে। কিন্তু এই পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কোবের মা-বাবাকে রাজি করানো। তারা কিছুতেই রাজি ছিলেন না ছেলের এই রুপান্তরে। এদিকে বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া কোবে সার্জারি করাতেও পারছিল না কারন তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।
এরপর অনলাইনে ট্রান্স কমিউনিটির সাথে কোবে পরিচিত হয় এবং তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। নিয়মিত গল্প হতো তাদের। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক ট্রান্সজেন্ডার লোকেরা কোবে সহ আরও অনেক শিশু-কিশোরদের শিখিয়ে দেয় মা-বাবাদেরকে সুইসাইডের ভয় দেখাতে। তাদের কথামতো কোবে তার বাবা-মাকে জানায় তাঁরা এই রুপান্তরের পক্ষে না থাকলে কোবে আত্মহত্যা করবে। অসহায় পিতা-মাতা তখন সায় দিতে বাধ্য হন এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সে পিউবারটি ব্লকার শুরু করার মাধ্যমে কোবের স্বাভাবিক বয়:সন্ধিকালীন পুরুষত্ব বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জন্মগত ভাবে পুরুষ হওয়ার পরেও সে কখনো জানতে পারেনি স্বাভাবিক পুরুষালি বৈশিষ্ট্য কেমন হয়, কিংবা কেমন লাগে একজন সুস্থ স্বাভাবিক পুরুষ হয়ে বেড়ে উঠতে। পরবর্তীতে ১৬ বছর বয়সে ইস্ট্রোজেন বা নারী হরমোন প্রয়োগ করা হয় কোবের শরীরে এবং ১৯ বছর বয়সে আজীবনের মতো তার পুরুষত্ব ধ্বংস করে দেওয়া হয় অন্ডকোষ কেটে ফেলার মাধ্যমে।
কোবে ভেবেছিল রুপান্তরের পর তার মানসিক অশান্তির দিন বোধহয় শেষ হতে চলেছে। কিন্তু সে অবাক হয়ে আবিষ্কার করে মানসিক শান্তি তো নেইই, বরং অনেক গুণে বেড়ে গিয়েছে, সাথে যোগ হয়েছে অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে সে হারিয়েছে তার স্বাভাবিক যৌন ক্ষমতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তাকে হাড় ক্ষয় রোগে ভুগতে হচ্ছে, যার ফলে তার মেরুদণ্ডে ও অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। সে প্রায়ই মস্তিস্ক জড়তা বা ব্রেইন ফগে ভুগতো যা তার দৈনন্দিন জীবন যাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যহত করছিল। কারও সাথে স্বাভাবিক কথোপকথন চালাতে গিয়ে সে প্রায়ই থমকে যেতো, পড়াশোনায় মন দিতে পারতো না, কোনো কাজেই আগ্রহ ছিল না, এমনকি সে তার থেরাপিস্টের সাথেও ঠিকভাবে কথা চালাতে পারছিল না। কাটা জায়গাতে ব্যথা ও যৌনাঙ্গে অবশ অনুভব করতো। কোবের মতে পিউবারটি ব্লকার শুধু তার বয়ঃসন্ধিকেই আটকায়নি, বরং তার পুরো জীবনের সুখকে আটকে দিয়েছিল। সে আরও জানায় তার পরিচিত অন্য যেসব পুরুষেরা নারী হরমোন নিয়েছিল তাদের সবার অভিজ্ঞতাই এক।
ইস্ট্রোজেনের মেটাবলিজমের উপর প্রভাবের কারণে কোবে ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়। ফলে সে ঠিকমত খেতে না পারায় অপুষ্টি ও অন্যান্য জটিলতায় ভুগছিল। কোবেকে বুঝানো হয়েছিল তার শরীরে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন “বিষ” সমতূল্য যা অত্যন্ত ক্ষতিকর তার জন্য। কেন তার সাথে এমনটা ঘটলো এটা ভেবে সে অস্থির হয়ে যেত। সবকিছু মিলিয়ে তীব্র মানসিক চাপে কোবের মারা যেতে ইচ্ছে করতো। সে পাগল হয়ে যাচ্ছিল। এসবকিছুর জন্যই কোবে দায়ী করে তার চিকিৎসকদের। কোবে জানায় তার চিকিৎসকেরা রুপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটিকে অনেক সহজ আর সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছিল যার ফলে সে এই পথ বেছে নেয়। কিন্তু চিকিৎসকদের কথার কোনটিই সত্য নয় সে এখন তা উপলব্ধি করতে পারে। চিকিৎসকেরা রিপোর্টে লিখে কোবের সার্জারি সফল হয়েছে এবং সে অনেক সুখে আছে ও মানসিকভাবে সুস্থ, যা পুরোপুরি মিথ্যা বলে জানায় কোবে।
পরবর্তী অস্ত্রোপচার ছিল লিঙ্গ পুনর্বিন্যাসকরণ বা sex-reassignment surgery (SRS) যেখানে কোবের শরীরে কৃত্রিম যোনিপথ তৈরি করা হবে এবং ধাপে ধাপে তা প্রসারিত করা হবে। কিন্তু ইন্সুরেন্স জনিত জটিলতায় তা আর করা সম্ভব হয়নি, যেটাকে এখন আশীর্বাদ মনে করে কোবে। কারণ ইতোমধ্যেই সে আবার পুরুষে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া ডিট্রানজিশনিং শুরু করেছে। পিউবারটি ব্লকার ও নারী হরমোন নেওয়া বন্ধ করেছে এবং পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন গ্রহণ শুরু করেছে যা তাকে আজীবনই গ্রহণ করে যেতে হবে। কারণ অন্ডকোষ ফেলে দেওয়ায় কোবের শরীর আর কখনই স্বাভাবিকভাবে টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু কোনটিই উৎপাদন করতে পারবে না।
কোবে তার গোপনাঙ্গে এখনো তীব্র ব্যথা অনুভব করে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে এবং মূত্রত্যাগের সময়। কিন্তু টেস্টোস্টেরন থেরাপি শুরু করার পর আগের চেয়ে অনেক সুস্থ বোধ করে সে মানসিক ও শারীরিকভাবে। নিজেকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী লাগে তার এখন। সে জানায় এক সময় নিজেকে পুরুষ হিসেবে মেনে নিতে না চাইলেও এখন সে উপলব্ধি করে যে পুরো বিষয়টিই কতটা অসঙ্গতিপূর্ণ। কোবে জানায়, “লোকে বলে ট্রান্সনারীদের মাসিক হয়, তারা আসলে পুরুষের শরীরে আটকে পড়া নারী- এই বলে তারা পুরুষাঙ্গ নিয়েই মেয়েদের সবকিছুতে ঢুকে পড়ছে। মেয়েদের খেলাধূলা, লকার রুমে পর্যন্ত তারা চলে যাচ্ছে, প্রকৃত নারীদের বঞ্চিত করে তারাই সমস্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। এই বিষয়গুলো আসলে কোনভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কোবে জানায় সে বিজ্ঞান ভালবাসে, প্রাণিবিদ্যা নিয়ে তার পড়াশোনা করার ইচ্ছে। ভবিষ্যতে সে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের নিয়ে কাজ করতে চায়- এটা তার ছোটবেলার স্বপ্ন। কিন্তু মাঝখানের অভিশপ্ত দিনগুলোর জন্য সে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গিয়েছিল, তার কোন শখ আহ্লাদ কিছুই ছিল না, ছিল না জীবনের কোনো উদ্দেশ্য। কোবের ভাষ্যমতে সে শুধুই একটা নারীর ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত হয়েছিল। ফলস্বরূপ তাকে সারাজীবনের জন্য অসুস্থতাকে বরণ করে নিতে হলেও এখন সে আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র:
