বাংলাদেশে ’ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদ’ এর সূচনা ও ক্রমবিকাশ (পর্ব-২)

Share

ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ প্রসারে কার্যক্রম:

গত ৭-৮ বছরে বাংলাদেশে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের প্রসারে ব্যাপক কার্যক্রম হয়েছে। বাংলাদেশের এলজিবিটি আন্দোলন বর্তমানে তাদের পুরো শক্তি একত্রিত করেছে ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়েছে, মিডিয়াতে ট্র্যান্সজেন্ডারদের তুলে ধরা হচ্ছে ইতিবাচকভাবে, প্রশাসনিকভাবে তাদের একধরণের অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদের এই ব্যাপক প্রচারণা ও প্রভাবের পেছনেও আছে সেই পুরনো খেলোয়াড়েরা। পশ্চিমা দাতা, বৈশ্বিক এলজিবিটি নেটওয়ার্ক আর দেশীয় এনজিও। ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদ প্রতিষ্ঠায় এসব এনজিও এবং বিভিন্ন এলজিবিটি সংগঠনগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে এই ইস্যু নিয়ে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কর্মকান্ড থেকে।

প্রথমদিকে সমকামী পুরুষদের নিয়ে কাজ করলেও গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ নিয়েও প্রচুর কাজকর্ম করে যাচ্ছে বন্ধু। নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া বাৎসরিক প্রতিবেদনগুলোতে খুটিয়ে খুটিয়ে নিজেদের কার্যকলাপের ফিরিস্তি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব প্রতিবেদন যেহেতু ডোনারদের জন্য বানানো তাই কিছুটা অতিরঞ্জন এতে থাকা স্বাভাবিক। তবে সামগ্রিক যে চিত্রটা পাওয়া যায় তা মোটাদাগে সঠিক। এই প্রতিবেদনগুলো থেকে যা বোঝা যায় তা হল, ট্র্যান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তকে ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদের শিক্ষা, এমনকি মিডিয়াতে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের পক্ষে প্রচারণার, প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে আছে এলজিবিটি সংগঠন, এনজিও এবং তাদের পশ্চিমা মালিকেরা।

মিডিয়া

অনেকেই লক্ষ্য করেছেন গত ২/৩ বছর ধরে মিডিয়াতে ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদ এবং পরিচয়কে তুলে ধরা হচ্ছে ইতিবাচকভাবে। ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ নিয়ে নিউজ মিডিয়াতে নিয়মিত আসছে নানা ধরনের প্রতিবেদন। বিনোদন জগতের মাধ্যমেও ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সুন্দরী প্রতিযোগিতাতেও নারী সাজা পুরুষদের স্থান দেওয়া হচ্ছে।  এদের মধ্যে কেউ কেউ রানারআপও হয়েছে! 

বিভিন্ন বেসরকারী টিভি চ্যানেলের টক শো তে অতিথি হিসেবে আনা হয়েছে নারী সাজা পুরুষদের। সুস্থ দেহের মানুষ অপারেশন করে ‘লিঙ্গ পরিবর্তন’ করছে এমন ঘটনাকে দেখানো হচ্ছে ইতিবাচকভাবে। নারী সাজা পুরুষদের মডেল বানিয়ে আলাদাভাবে নিউজ করা হয়েছে পত্রিকার ফ্যাশন সাময়িকীতে।

এ খবরগুলো দেখতে থাকলে যেকোন মানুষের মনে হতে পারে, হয়তো আমাদের সমাজে দিন দিন ‘ট্র্যান্সজেন্ডার’ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আর তাই এতো জায়গাতে দেখা যাচ্ছে তাদের। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা না। মিডিয়াতে আসা এই সব ব্যক্তিরা ঘুরেফিরে একই দাতা-এনজিও-অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের অংশ। অল্প কিছু মানুষকে কৌশলে বারবার নানাভাবে মিডিয়াতে আনা হচ্ছে যাতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা যায়।

ব্র্যাক যেমন এলজিবিটির ব্যাপারে ইতিবাচক খবর প্রকাশের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছিল ঠিক একই পদ্ধতি কাজে লাগানো হচ্ছে ট্র্যান্সজেন্ডারের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ ট্র্যান্সজেন্ডার নিয়ে ইতিবাচকভাবে লিখলেই সাংবাদিকরা পাচ্ছে ‘পুরস্কার’। এ কথার স্বীকৃতি এসেছে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ নিয়ে কাজ করা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নিজস্ব নথিপত্রে। বন্ধু-র ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,

বন্ধু শক্তিশালী মিডিয়া অ্যাডভোকেসি চালিয়ে গেছে যার ফলে ‘নাটক, কমিউনিটি রেডিও , শর্ট ফিল্ম, গণসাক্ষর অভিযান এবং অন্যান্য ভাবে মিডিয়াতে জেন্ডার বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিদের (জিডিপি) শক্তিশালী ইতিবাচক উপস্থাপনা ঘটেছে।’

২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী ৫৬ জন সাংবাদিককে ‘মিডিয়া ফেলোশিপ’ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বন্ধুর কাছে প্রশিক্ষণ পাওয়া এই মিডিয়া ফেলোরা ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত পাঁচ বছরে যৌন সংখ্যালঘুদের (অর্থাৎ এলজিবিটি) নিয়ে পত্রপত্রিকাতে  মোট ১৪৭টি প্রতিবেদন করেছে।

২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মিডিয়ার জন্য বন্ধু-র বারো সদস্যদের উপদেষ্টা কমিটি আছে। এই কমিটি প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া স্ট্র্যাটিজি ঠিক করে। এছাড়া পুরো দেশের বন্ধুর ৯০ জন ‘মিডিয়া ফেলো’ আছে। যেসব সাংবাদিক ‘যৌন বৈচিত্র্যময়’ মানুষদের নিয়ে, অর্থাৎ নারী সাজা পুরুষ বা পুরুষ সাজা নারীদের নিয়ে লেখালেখি করতে ‘আগ্রহী’, বন্ধু তাদেরকে ফেলোশিপ প্রদান করে।

এছাড়া একাধিক বেসরকারী টিভি চ্যানেলে (আর টিভি, ডিবিসি ও বাংলা ভিশনে) ট্র্যান্স টক – নামে অনুষ্ঠান স্পন্সর করেছে বন্ধু। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চলছে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের সামাজিকীকরনের কাজ।

বন্ধুর ভাষ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের মিডিয়া এলজিবিটি অধিকার সুরক্ষা এবং দাবি আদায়ের ‘দক্ষ ওয়াচডগে’ পরিণত হয়েছে। মিডিয়া যে এলজিবিটি নিয়ে প্রশিক্ষিত কুকুরের মতো আচরণ করছে বন্ধু-র এই দাবির সাথে দ্বিমত করার অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।

সরকার,প্রশাসন

সেই ২০০৭ সাল থেকেই এনজিওগুলো সরকারী নীতিনির্ধারকদের এলজিবিটি এজেন্ডার সমর্থকে পরিণত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয় এবং জাতীয় মানবাধিকার কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘এলজিবিটি এজেন্ডার প্রতি সহনশীল’ করে তুলতে সক্রিয় ও সফল ভূমিকা রেখেছে তারা। এমনকি বন্ধুর দাবি মতে জাতীয় সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং পলিসি এবং জাতীয় লিগ্যাল এইড সেবা সংগঠনগুলোকেও ‘যৌন সংখ্যালঘুদে’র (অর্থাৎ এলজিবিটি) ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান নিতে প্রভাবিত করেছে তারা।

ট্র্যান্সজেন্ডারদের ‘অন্তর্ভুক্তির’ জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে ডিসি, সাংবাদিক, মিডিয়া, উকিল, নাগরিক সংগঠন এবং ট্র্যান্সজেন্ডারদের নিয়ে অ্যাডভোকেসি করেছে বন্ধু। এধরনের অ্যাডভোকেসির ফলস্বরূপ হবিগঞ্জের ডিসি অফিসের পক্ষ থেকে হিজড়া ও ট্র্যান্সজেন্ডারদের জন্যে ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে’ একটি বিলবোর্ড টাঙ্গানো হয়েছে।  বন্ধুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিলবোর্ড উদ্বোধনের সময় এনডিসি, অ্যাসিসটেন্ট কমিশনার এবং এক্সেকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন,

আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি। বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে, আমরা আপনার অধিকার নিশ্চিত করতে আপনার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছি এবং আপনার সাথে একসাথে কাজ করতে একমত পোষণ করছি।”

অন্যান্য:

ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের প্রসারে বন্ধু-র আরও কিছু কর্মকান্ডের তালিকা দেখা যাক-

  • লিগ্যাল হেল্পলাইন তৈরি করেছে।
  • সমকামী ও অন্যান্য বিকৃতকামীদের ‘মানবাধিকারের’ ব্যাপারে পাঁচশোর বেশি পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘সংবেদশনশীল’ করে তুলেছে বন্ধু।
  • সিলেট হবিগঞ্জ ও মৌলভী বাজারে ইউনিয়ন পর্যায়ে ৯০টি ‘সংলাপ অনুষ্ঠান’ হয়েছে, যেখানে মোট ১৬২০ জন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য অংশগ্রহন করেছে। এসব সংলাপে ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে ‘ট্র্যান্সজেন্ডার এবং হিজড়াদের অন্তর্ভুক্তির’ কথা বলা হয়েছে।
  • বন্ধুর উদ্যোগে তিন বিভাগে কমিটি তৈরি করা হয়েছে। এই কমিটিগুলোর কাজ হল হিজড়া এবং ট্র্যান্সজেন্ডারদের পক্ষে ওকালতি করা। বিভিন্ন অঙ্গন থেকে ৭৫ জনকে এসব কমিটির মেম্বার বানানো হয়েছে।
  • এলজিবিটি অ্যাক্টিভিসমের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতেও কাজ করেছে বন্ধু। ২৫টি তৃণমূল সংগঠনের ৩৫ জন ব্যক্তিকে অ্যাক্টিভিসমসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বন্ধু
  • স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ৭৪ জনের বেশি স্টাফকে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের ব্যাপারে সবক দেয়া হয়েছে ।
  • ট্র্যান্সজেন্ডারদের চাকরির সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের সাথে ‘লিংক’ তৈরি করা হয়েছে।
  • ট্র্যান্সজেন্ডারদের মূল ধারার চাকরির বাজারে সুযোগ দেয়ার জন্য চেইম্বার অফ কমার্স, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশের ব্যাংকের কাছে অ্যাডভোকেসি করেছে।
  • ব্র্যাকের অনুকরণে এমপি, অ্যাকাডিমক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রথম আলোর সাথে মিলে গোল টেবিল বৈঠক আয়োজন করেছে, যেখানে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল হিজড়া ট্র্যান্সজেন্ডারদের ‘যৌন অধিকার’ সুরক্ষা, এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘বৈষম্য প্রতিরোধ’।
  • বাংলাদেশ মেডিকাল স্টুডেন্ট সোসাইটি (বিএমএসএস) এর সাথে মিলে তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে কাজ করেছে।
  • রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলজিবিটি মতবাদের ধ্যানধারণার সবক দেয়া হচ্ছে।
  • জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিপোর্টের বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থতিত মূল্যায়নের প্রতিবেদনে তৈরিতে অংশ নিয়েছে। ট্র্যান্সজেন্ডারদের নিয়ে আলাদা আইনের কথা বলেছে
  • ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ করে লিঙ্গ পরিবর্তনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের হরমোন থেরাপির ব্যবস্থা করে দিয়েছে
  • নিজেদের ট্র্যান্সজেন্ডার দাবি করা লোকেরা নিজেদের সমকামী যৌনতার কারণে যৌনাঙ্গ ও মলদ্বারের বিভিন্ন যৌন রোগে আক্রান্ত হয়। এদের সহজে চিকিৎসা দেয়ার জন্য অনলাইন এবং অফলাইন পরামর্শের ব্যবস্থা করেছে বন্ধু।

এই রিপোর্টগুলো তাদের সাইটে দেয়া আছে, যে কেউ যাচাই করে নিতে পারেন। এই প্রতিষ্ঠানের ডোনার বা অর্থায়নকারীদের মধ্যে আছে বিদেশী এনজিও, বিভিন্ন দূতাবাস, ইউএসএইড, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থা।

বাংলাদেশে এলজিবিটি এজেন্ডা এগিয়ে নেয়ার জন্য আক্ষরিক অর্থে শত শত কোটি কোটি টাকা খরচ করছে পশ্চিমারা।  এ এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাদের হয়ে কাজ করছে দেশীয় এনজিও আর সমকামী সংগঠনগুলো। আর এ কাজ করা হচ্ছে ট্র্যান্সজেন্ডার শব্দের আড়ালে।


Share