কেস স্টাডি – ৩

Share

হেলেনার ডি-ট্রানজিশনের গল্প

আমার নাম হেলেনা কার্শনার। আমি ২৩ বছর বয়সী একজন ডিট্রান্স নারী। জন্মগতভাবে আমি একজন মেয়ে। জীবনের একটা পর্যায়ে আমি পুরুষে রূপান্তরিত হয়েছিলাম তবে আবারও নিজের জন্মগত লিঙ্গে ফেরত আসি।

আমার ট্রানজিশনের জার্নি টা ছিল ধীর প্রক্রিয়ায়। এটা এমন ছিল না যে আমি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে ছেলে বলতে শুরু করলাম। শৈশবে লিঙ্গ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই ছোটবেলায় মেয়েদের জামা কাপড় পরতাম, মেয়েদের খেলনা খেলতাম, মেয়েদের মতো সাজগোজ করতাম। পোশাক, খেলনা নিয়ে কখনোই কোন সমস্যা হয়নি বরং আমি সেগুলো খুবই পছন্দ করতাম। তবে পরিবর্তনটা শুরু হয় বয়সন্ধিকালে যখন আমার বয়স ১৫। জীবনের এমন একটা খারাপ সময় পার করছিলাম যখন আমার তেমন কোন বন্ধু ছিল না। আসলে আমি কারো সাথে মিশতে চাইতাম না, স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপারটা হলো আমি নিজের শরীর নিয়ে খুবই অনিরাপদ বোধ করতাম যা আমাকে খুবই পীড়া দিত। 

মূলত এই সময়টাই ইন্টারনেটের দিকে বেশি ঝুঁকে যাই। অনলাইনে কিছু মেয়ের সাথে পরিচয় হয় যাদের একটা বড় কমিউনিটি ছিল। তারা আমাকে তাদের কমিউনিটিতে সাদরে গ্রহণ করে নেয় এবং আমার সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতো। তারা মাঝে মাঝে আমার জীবনের স্বপ্ন, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, নিয়ে জানতে চাইত এবং আমিও তাদের সাথে আমার মনের কথাগুলো শেয়ার করতাম। তাদের একটি ওয়েবসাইট ছিল। যেখানে Gender Ideology সম্পর্কিত অনেক কন্টেন্ট ছিল। Gender Ideology সম্পর্কে একমত হওয়া ছিল সোশ্যাল কমিউনিটি গুলোতে অংশগ্রহণ করার পূর্ব শর্ত। সেখানে কিছু ছোট ছোট টাস্ক থাকতো যেমন: উচ্চারণ পরিবর্তন করা। আমি সেই টাস্ক গুলো দিয়ে উচ্চারণ পরিবর্তন করা শুরু করি। একটা একটা করে টাস্ক কমপ্লিট করে আমি সামনে আগাচ্ছিলাম এবং সবাই আমাকে পজিটিভ ফিডব্যাক দিত। এভাবে দুই থেকে তিন বছর পরে আমি আস্তে আস্তে নিজেকে ছেলে ভাবতে শুরু করি। তারা লিঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য উৎসাহ দিত। জেন্ডার ডিসফোরিয়া সম্পর্কে তারা ভুল ব্যাখ্যা করতো এবং অধিকাংশ লোকই উদ্ভট চিন্তাধারার মানুষ ছিল। কমিউনিটিতে কেউ কেউ এমনও বলতো “যদি তুমি তোমার দেহকে পছন্দ না করো- তাহলে এটাই জেন্ডার ডিসফোরিয়ার লক্ষণ, যদি কোন মেয়ের সাথে মিশতে না পারো তাহলে বুঝে নিবে তোমার জেন্ডার ডিসফোরিয়া রয়েছে। এমনকি মোবাইলের ভয়েস রেকর্ডে যদি নিজের কন্ঠস্বর শুনতে বাজে লাগে তাহলে এটাও জেন্ডার ডিসফোরিয়ার লক্ষণ।” প্রতিনিয়ত এমন পোস্ট পড়তে পড়তে অবচেতন মনে আমি ধরে নিয়েছিলাম আমার জেন্ডার ডিসফোরিয়া রয়েছে।তারা আমাকে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতো এবং আমিও ফ্যান্টাসিতে ভুগতাম। প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং করতে করতে একটা পর একটা ম্যাসেজ পাওয়া, একের পর এক সুদর্শন কিউট ছেলেদের ছবি দেখা, নতুন নতুন আইডিয়া পাওয়া সবকিছু আমাকে একটাই বার্তা দিত যে আমি ছেলে। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল যার বাস্তব কোন ভিত্তি নেই।

১৮ বছর বয়সে আমি ট্রানজিশন তথা লিঙ্গ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেই। প্রথমেই মাকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলাম। মা-মেয়ের মধ্যে সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক না থাকায় সে আমার ওপর প্রচন্ড রাগ দেখায় ফলে আমিও জিদ ধরে বসে থাকি এবং কাজটা অতি দ্রুত করার সিদ্ধান্ত নেই।

অবশেষে কিছু পুরুষ হরমোন আমার শরীরে নেয়ার জন্য হাসপাতালে যাই। প্রথমদিন ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট এ তারা আমাকে এর সাইড ইফেক্ট সম্পর্কে তেমন কিছু জানায়নি। তারা পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলছিল এবং জানতে চাইছিল যে কম ডোজের মেডিসিন দিয়ে শুরু করতে চাই নাকি বেশি ডোজের মেডিসিন দিয়ে। আমি তাকে হাই ডোজের মেডিসিন দিতে বলি কারণ আমার নিতম্ব অনেক স্ফীত ছিল; ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা আমার শরীরে বেশি আছে বলে মনে হয়েছিল। আমার কথা মতো সে ১০০ মিলিগ্রাম টেস্টোস্টেরন হরমোন আমার শরীরে পুশ করে এবং নিয়মিত তা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল।

একটুতেই বিরক্ত হয়ে যাওয়া ছিল আমার প্রথম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। অনিয়ন্ত্রিত রাগ, হতাশা এবং অস্থিরতার কারণে আমি এক ঘরে হয়ে যাই। কেউ আমাকে বুঝতো না। তখন যৌন আকাঙ্ক্ষা আগের থেকে দ্বিগুণ বেড়ে যায় এবং এই অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না। অনিয়ন্ত্রিত রাগের কারণে নিজের শরীরে নিজেই আঘাত করতাম। রূপান্তরের পূর্বে আমি যেভাবে আমার ইমোশন তথা আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতাম, যেমন-খারাপ লাগলে কান্নাকাটি করা রূপান্তরের ঠিক পরে ইমোশন প্রকাশ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। সহজে কাঁদতে পারতাম না ফলে প্রচন্ড রেগে যেতাম এবং জিনিসপত্র ভাঙচুর করতাম। প্রাথমিকভাবে ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম কিন্তু ট্রানজিশন এর পরে মেয়েদের প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করতাম না তবে কোনো নগ্ন নারীর ছবি দেখলে বা কল্পনা করলে উত্তেজিত হয়ে যেতাম।

মানসিকভাবে একদমই স্থির হতে পারছিলাম না। সমস্যাগুলো দিনকে দিন বাড়তে থাকল এবং আমি দুইবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো কোনো চিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্ট আমার সমস্যার কারণ হিসেবে টেস্টোস্টেরন হরমোনের কথা উল্লেখ করেনি বরং তারা বিভিন্ন রোগের কথা উল্লেখ করে আমাকে ঔষধ প্রেসক্রাইব করেছে। সুস্থ না হওয়াতে কিছুদিনের জন্য আমি ডোজের মাত্রা কমিয়ে দিলাম এবং অবাক হয়ে খেয়াল করলাম যে আমার সমস্যাগুলো আগের থেকে অনেকাংশে কমেছে। তখন আমি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি যে আমি মানসিক রোগে আক্রান্ত নই বরং তা টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাব।

তখন আমি উপলব্ধি করি টিনএজ বয়সে আমি যে ফ্যান্টাসিতে ভুগতাম বাস্তবতার সাথে তার কোনো মিল নেই। রূপান্তরের আগে ও পরের জীবন তুলনা করে আমি নিজের ভুল বুঝতে পারি। ততদিনে হরমোনের সেবন সম্পূর্ণভাবে বাদ দেই। সাড়ে ১৯ বছর বয়সে  পুরুষালী হরমোন স্থায়ীভাবে বর্জন করে আমি আবারও সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে নারীত্বের স্বাদ পাই। রূপান্তরের ভয়ানক ছোবল থেকে মানুষকে সচেতন করার জন্য বর্তমানে Genspect নামক সংস্থার সাথে যুক্ত থেকে জনকল্যাণমূলক কাজ করছি। 


Share