নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইন্টারনেট চ্যাট গ্রুপ, মেইল গ্রুপ এবং ফোরামের মাধ্যমে সমলিঙ্গের সাথে যৌনতায় আসক্ত ব্যক্তিদের একধরনের অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। সমকামীরা এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যৌন সঙ্গী খুঁজে বের করতো। সমকামী অ্যাক্টিভিস্টদের বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং সাক্ষাতকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে রেঙ্গু নামে একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি ‘গে বাংলাদেশ’ নামে একটি অনলাইন গ্রুপ তৈরি করে। এটি ছিল বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম গ্রুপ।
বাংলাদেশের এলজিবিটি অ্যাক্টিভিসমের প্রতিটা ধাপেই বিদেশী কানেকশন খুঁজে পাওয়া যায়। বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের শুরু বিলেত ফেরত ভারতীয় শিবানন্দ খানের মাধ্যমে। ব্র্যাকের কর্মকান্ডের ‘অনুপ্রেরণা’ আসে ব্রিটেনে কনসোর্টিয়ামে অংশগ্রহনের পর।
আর সমকামী ই-গ্রুপগুলোর পথচলা শুরু হয় বিদেশফেরত রেঙ্গুর মাধ্যমে। ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর সদস্য রেঙ্গু পড়াশোনার জন্য জীবনের উল্লেখযোগ্য একটা সময় কাটিয়েছিল পশ্চিমে। ২০০৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় রেঙ্গু। গে বাংলাদেশের কার্যক্রম থেমে যায় সেখানেই।
কিন্তু গে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রানিত হয়ে ২০০২ গড়ে ওঠে আরেকটি ই-গ্রুপ, বয়েস অফ বাংলাদেশ (Boys of Bangladesh/BoB)। কাজী হক নামে একজন ব্যক্তি (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী) ইয়াহু চ্যাটে এই গ্রুপটি চালু করে।

অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনে ‘গেট টুগেদার’ এবং ‘ডিজে পার্টি’-র আয়োজন করতে শুরু করে বয়েস অফ বাংলাদেশ। এই অনুষ্ঠানগুলো ছিল সমকামীদের জন্য যৌন সঙ্গী বাছাইয়ের আর এক সাথে ‘ফূর্তি’ করার সুযোগ। বয়েস অফ বাংলাদেশের সদস্যরা ছিল মূলত মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির। তাদের ‘অনুষ্ঠান’গুলো হতো ঢাকাতে। অন্যদিকে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ছিল মূলত নিম্ন, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং ঢাকার বাইরের সমকামীদের নিয়ে।
২০০৫ সালে বন্ধু-র সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বয়েস অফ বাংলাদেশের। একই বছরের এপ্রিলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর সাথে মিলে বাংলাদেশে এলজিবিটি সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষনাতে কাজ করে তারা। তবে এ গবেষনার ফলাফল পরে আর প্রকাশিত হয়নি।
প্রথম পাঁচ বছরে বয়েস অফ বাংলাদেশের কার্যক্রম অনলাইন নেটওয়ার্কিং আর অফলাইন ‘ডিজে পার্টি’-র মধ্যে সীমিত থাকে। পরিবর্তন আসতে শুরু করে ২০০৭ থেকে। সে বছর ব্র্যাকের জেইমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ আয়োজিত আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করে বয়স অফ বাংলাদেশ।
এই ওয়ার্কশপ গভীরভাবে প্রভাবিত করে তাদের কাজের গতিপথকে। ‘ডিজে পার্টি’র পাশাপাশি তারা অ্যাক্টিভিসমে আগ্রহী হয়ে ওঠে, অন্যদিকে এলজিবিটি এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথেও সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করে তাদের।
ব্র্যাকের অনুষ্ঠানের পর প্রকাশ্যে কাজ করা শুরু করে বয়েস অফ বাংলাদেশ। ২০০৮ সালে প্রথম বারের মতো এলজিবিটির প্রতীক রংধনু পতাকা টাঙ্গিয়ে ধানমন্ডির জার্মান ইন্সটিটিউটের ছাদের ক্যাফেতে অনুষ্ঠান করে তারা। এটাকে সমকামী অধিকার নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠান বলা যেতে পারে। এখানেও সেই একই পশ্চিমা কানেকশন।
একই বছর নেপালের কাঠমুণ্ডুতে এলজিবিটি এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংগঠনকে নিয়ে ওয়ার্কশপ আয়োজন করে Blue Diamond Society নামে একটি সমকামী সংগঠন। এ ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করে বয়েস অফ বাংলাদেশের সদস্য শওকত ইমাম রাজীব। এ ওয়ার্কশপের অর্থায়ন করে এলএলএইচ নামে নরওয়ের একটি সমকামী সংগঠন। পরবর্তীতে এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশেও সমকামী অ্যাক্টিভিসমের অর্থায়ন করবে। মজার ব্যাপার হল ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটি এবং এর প্রতিষ্ঠাতার সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল নায ফাউন্ডেশনের শিবানন্দ খানের। ২০০৮ এ ব্র্যাকের আয়োজিত বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও গবেষণাতেও অংশ নেয় বয়েস অফ বাংলাদেশ।
২০০৯ সালে বয়েস অফ বাংলাদেশ কক্সবাজারে একটি ওয়ার্কশপ আয়োজন করে। এটি ছিল বাংলাদেশে কোন সমকামী সংগঠনের আয়োজিত প্রথম ওয়ার্কশপ। ‘Workshop on Sexual Diversity, Partnership Building and Networking’ শিরোনামের এ ওয়ার্কশপের ফান্ডিং করে নরওয়ের এলএলএইচ।সমকামী পুরুষ ও নারীদের বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে হিজড়া সম্প্রদায়, মিডিয়া এবং ‘সুশীল সমাজ’ এর কিছু প্রতিনিধিও। ওয়ার্কশপে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
প্রথমত: বিকৃত যৌনতার বৈধতা আদায়ের জন্য একটি কোয়ালিশন বা জোট গঠন করা।
দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিলের জন্য কাজ করা।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ এ জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউতে ৩৭৭ ধারা বাতিলের সুপারিশ করা হয়। জাতিসংঘে এই সুপারিশ তোলা এবং বাংলাদেশ সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে এসআরআই (সেক্সুয়াল রাইটস ইনিশিয়েটিভ) নামে একটি আন্তর্জাতিক এনজিও। আর এসআরআই-কে সহযোগিতা করে বয়েস অফ বাংলাদেশ।
বয়েস অফ বাংলাদেশের মতো একটি অনিবন্ধিত, ইন্টারনেটকেন্দ্রিক সংগঠন কতো সহজে জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত পৌছে যেতে পারে তা থেকে বৈশ্বিক এলজিবিটি মাফিয়ার শক্তি ও বিস্তৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র : আসিফ আদনান
