ভেতরের ঘরে পা রেখেই চমকে উঠলেন আফসার। রেণু টেবিলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অদূরে কান্নারত স্ত্রীকে দেখেও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন না। বড় পিপাসা পেয়েছে। এখন একটা জলের গ্লাসের কাছে পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা ম্লান। বিকেল শেষের এই সময়টাতে অত দূরের পথ পায়ে হেঁটে আসতে বড্ড ক্লান্তি বোধ করেন আফসার। শীতের বিকেলের মরা রোদেও গলা শুকিয়ে মরুভূমি হয় রোজ। সারা পথ শেষে চৌকাঠ ডিঙিয়েই হাঁক ছেড়ে রেণুকে ডাকেন ঠান্ডা পানির জন্য। আজও ডেকেছিলেন। রেণুর সাড়া না পেয়ে বাইরের জামাকাপড় নিয়ে শেষে শোবার ঘর অবধি অগ্রসর হতে হলো।
‘রেণু, এই রেণু। কী হলো? কাঁদছো কেন?’ আফসারের গলা ভিজেছে। হাঁকডাক শুনে কাজের ছেলেটাই দিয়ে গেছে এক গ্লাস পানি। স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে আফসার চিন্তাগ্রস্ত স্বরে বলেন, ‘দেখোতো কী মুশকিল! কাঁদবার কারণ টা তো বলবা? তোমার বাড়ি থেকে কোনো খারাপ খবর আসেনি তো? আম্মার শরীর টা হঠাৎ খারাপ করলো নাকি?’
এতক্ষণে রেণু একবার মাথা নাড়লো। ইশারায় বোঝালো সেসব কিছু নয়৷ আফসার আবার ভাবতে বসলেন, ভেবে আরেকবার ঢিল ছুড়লেন আন্দাজে, ‘আচ্ছা রাজু কিছু করেছে? সন্ধ্যা হতে চলল ওই বেয়াদবটা এখনো ঘরে ফিরল না যে?’
কোনো উত্তর নেই।
‘মামুন, এই মামুন’ ডাকতে ডাকতে আফসার নেমে আসেন উঠোনে। রসুইঘর থেকে মামুন ছুটে আসে।
‘কিরে রাজু কই? এখনো ফেরেনি দেখছি।’
‘ছোড ভাই মাডে গেছে।’
‘ও.. আচ্ছা।’
উত্তর দিয়েই মামুন রসুইঘরে ফিরতে উদ্যত হলে তিনি আবার পিছু ডাকলেন, ‘শোন মামুন’
দু পা এগিয়ে নিচু গলায় শুধালেন, ‘তোর খালাম্মার ব্যাপার কিছু জানিস? এভাবে কাঁদতাসে কেন?’
চা পাতার প্যাকেট সমেত মামুনের হাতটা হঠাৎ একটু কেঁপে ওঠে। গরিব ঘরের সন্তান। অভাব সামলাতে না পেরে বাপ মা অল্প বয়সে পাঠিয়েছে কাজে। সকাল সন্ধ্যার চা টা মামুন নিজের হাতেই সবার জন্য করে। মামুনের চেহারা সুন্দর। গায়েগতরেও নেই দারিদ্রের ছাপ। বেশ চনমনে শ্যামল শ্যামল গড়ন। গরুর মতো টানা দুই চোখ। বারো বছরের কিশোর দেহাবয়বে এখনো শিশুতোষ সারল্যের ছায়া। আফসার সরু চোখে তাকান।
‘কিরে, কিছু বলিস না যে?’
‘খালাম্মা ছোড ভাইরে মারসে খালুসাব। হের পর নিজেই কানতে লাগসে।’ থেমে থেমে খানিকটা তোতলিয়ে বলে মামুন।
কথাটায় সত্যতার গন্ধ আফসার কমই পেলেন। রেণুর কাছে রাজু হররোজ মা র খাচ্ছে। কোনোদিন তো ছেলে পেটানোর শোকে কাঁদতে দেখেননি রেণুকে!
.
‘এবার বলো দেখি কী হইছে?’ আফসার কথা শেষ করে তাকালেন রেণুর আবছা মুখের পানে। রাত বেড়েছে। অন্ধকার ঘরের বাইরে অবিশ্রান্ত ডাক ছাড়ছে ঝিঁঝিঁর দল। সামনের স্কুল ঘরের ফিঁকে আলো এসে ঠিকরে পড়েছে আফসারের মরিচাধরা জানালার গ্রিলে।
‘আহ রেণু, আর তামাশা কইরো না তো। জলদি বলো।’
‘বলতাছি…’ রেণুর নিম্নস্বর শোনা গেল।
‘আমাদের রাজু… ‘ শুধুমাত্র এইটুকু বলেই আবারো আঁচলে মুখ চাপলেন রেণু। আফসার দেখলেন মহা মুশকিল। রাজুর মায়ের কাছ থেকে কথা আদায় করাই দায় হয়ে পড়ছে।
তার বিরক্ত হাবভাব দেখে রেণু আর নিরব থাকার সাহস পেলেন না। বাষ্পরূদ্ধ গলায় আর্তনাদের মতো মনে হলো তার কণ্ঠ, ‘আমাদের রাজু নষ্ট হয়া গেছে গো। শেষ হয়া গেছে আমাদের রাজু…’
‘বলো কী এসব রেণু?’
রেণু কান্না চাপলেন, ‘সোহাগ ভাইয়ের ছেলেরা রাজুর ইস্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। ওরা নিত্য নিত্য রাজুর নামে নানান কুকথা কয়া যায়। আমি বিশ্বাস করি নাই। কিন্তু আজ নিজের চোক্ষে…’ কান্নার প্রাবল্যে হারিয়ে যায় রেণুর শব্দ।
‘দুপুরে দুধ দোয়ানোর জন্যে গোয়াল ঘরে গিয়া দেখি রাজু মামুনের সাথে… ‘ বাক্যের বাকি অংশ মুখে বলা নিষ্প্রয়োজন। স্ত্রীর মুখভাব দেখেই যা বোঝার বুঝে নিলেন আফসার। অবিশ্বাস ভরা চাহনিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রেণুর পানে। একসময় মেজাজ চরমে তুলে বললেন, ‘কিসব বলছো পাগলের মতো! রাজু নিজেই তো বাচ্চা ছেলে। ক্লাস সেভেনের একটা বাচ্চা এসবের বোঝে কী? তাছাড়া মামুন তো আর মেয়ে নয়। ছিঃ রেণু… মা হয়ে এত জঘন্য ধারণা তোমার ছেলে সম্মন্ধে? ওরা হয়তো খেলছিল। আর তুমি কিনা…’
‘মিছা কথা না গো। মায়ের চোখে সন্তানের ভালো মন্দ সবই ধরা পড়ে। আমারে দেইখা রাজুর মুখে যে ভয়ের ছায়া পড়ছিল তা আমি দেখছি। কী জঘন্য কথা। ভাবতেও ঘিন্না লাগে। ছিঃ আমাদের রাজু এসব শিখল কই থিকা বলতো? এইতো সেইদিনও ওরে পিঠ চাপড়াইয়া ঘুম পাড়াইছি আর আজ…’
কপালে হাত রাখলেন আফসার। তিনি দরদর করে ঘামছেন। ঘন হয়ে আসছে নিশ্বাস। চোখের সামনে অকূল সমুদ্র। রেণু যেভাবে বলছে তাতে ওকে অবিশ্বাস করা যায় না। অন্যদিকে রাজু তারই ঔরসজাত সন্তান। এক বংশ, একই রক্ত। সেই রক্তে যে এমন বিষ থাকতে পারে কে জানতো!
.
অনেকদিন পর সকালের এই সময়টা বাড়িতে কাটাচ্ছেন আফসার। শেষ রাত থেকে মাথা ঘুরছে, বুকেও মৃদু মৃদু ব্যথা টের পাচ্ছেন। এসব দেখেশুনে রেণু আজ স্কুলে যেতে দেয়নি। টিনের চালে রোদের সোনালি রেখা নাচছে। গাছে গাছে কিচিরমিচির গান ছড়াচ্ছে ভোরের পাখি। আফসার চোখ নামালেন। রাজুর ঘরের দরজাটা রশি দিয়ে বাঁধা। স্কুলে যাবার আগে রোজ সে নিজে বেঁধে রেখে যায়। এই দৃশ্য চির পুরনো। আজ নয়া চোখে দেখলেন আফসার। কী যেন রহস্য ঘাপটি মেরে আছে ওই বন্ধ কপাটের ওপাশে।
দরজাটা বেশ শব্দ করে মেললো। রসুইঘরে রান্না চাপিয়েছে রেণু। মামুন বার বাড়িতে গেছে গরুর জন্য ঘাস কাটতে। নিঃশব্দ বাড়িতে ছেলের শূন্য ঘরের হাট করে খোলা দরজার সামনে কয়েক মুহুর্ত থমকে দাঁড়িয়ে থাকেন আফসার।
টেবিলে রাজুর ছড়ানো ছেটানো বই, কিছুক্ষণ আগে ছেড়ে যাওয়া বাসি শার্ট প্যান্ট এখনো বিছানায় পড়ে আছে। সবেতে কৈশোরসুলভ বিমলতার রেশ। আফসারের চোখে সহসা একটু জলের আভাস আসে। বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন বহু দূরের শহরে। এই ছেলে তাদের শেষ অবলম্বন। অনিঃশেষ কত স্নেহ মমতার নিবিড় ঘেরাটোপে ঘিরে রেখেছিলেন শেষ সন্তানটিকে। সেই স্নেহের ধনের আজ এতো করুণ পরিণতি….
টেবিলের এককোণে উলটে রাখা ডায়েরিটা আফসার দূর থেকে কিছুক্ষণ দেখলেন। রাজু দিনলিপি লেখার অভ্যেসটা রপ্ত করেছিল বাবা আর বোনের কাছ থেকে। বড় মেয়ে আফসানার ডায়েরিখানা এখনো এবাড়িতেই আছে। সযতনে আলমিরায় তুলে রেখেছেন আফসার। মাঝে সাঝে দু এক পৃষ্ঠা পড়েন। তাকে সে অনুমতি আফসানা দিয়েছে। কিন্তু রাজু ডায়েরিতে কী লেখে কোনোদিন পড়ে দেখা হয়নি। আফসার হাতে নিয়ে পাতা ওল্টালেন। মাঝখানে কলম রাখা পাতাটা খুলে গেল। ওপরে তারিখ লেখা ২২\০১\২০২৪ অর্থাৎ আজ থেকে মাত্র ষোলো দিন পূর্বে। মূল বর্ণনার আগে শিরোনামে চোখ পড়ল আফসারের।
________
অন্যরকম :
স্কুলের মাহফুজ স্যার আজ ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে এক অদ্ভুত গল্প শুনিয়েছেন। গল্পটা নাকি আমাদের পাঠ্য বইয়ের। নতুন নতুন বই হাতে পেয়েছি বলে কারোরই অতদূর পড়া হয়নি। শুধুমাত্র রতন ছাড়া। রতন খুব পড়ুয়া ছেলে। নতুন বই পাওয়া মাত্র ও গ্রোগাসে সব গেলে। তাই ক্লাসে আমরা ওকে বিদ্যাসাগর স্কোয়ার ডাকি।
এবার আসি সেই অদ্ভুত গল্পে। মাহফুজ স্যার আজ বলেছেন ছেলে হিসেবে জন্মানোর পরও নাকি কেউ চাইলে মেয়ে হতে পারে। যদি সে মনে মনে নিজেকে মেয়ে মনে করে। ঠিক একই কথা মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর এমন ভাবে নাকি শরিফ নামের একজন ছেলে থেকে মেয়ে হয়েও দেখিয়েছে। সেই গল্পটাই উল্লেখ আছে আমাদের বইয়ে। স্যার আরো বলেছেন এভাবে কোনো ছেলে যদি মেয়ে হয়ে যায় তখন চাইলে সে আর দশজনের মতই একটা ছেলেকে বিয়ে করতে পারে। তার থেকেও বড় কথা উন্নত বিশ্বে নাকি এরকম পরিবর্তন ছাড়াই ছেলেতে ছেলেতে আর মেয়েতে মেয়েতে বিয়ে হচ্ছে। স্যারের কথা শুনে ক্লাসের সবাই হো হো করে খুব হেসেছে। পিন্টুর সঙ্গে সুমনের খুব ভাব বলে সবাই বলতে শুরু করেছে ওরা দুজন বড় হয়ে একজন আরেকজনকে বিয়ে করবে। এই নিয়ে সবাই খুব মজা করছে। আমারও মজা লাগছে। আবার ভালোও লাগছে…
আফসার পাতা ওল্টালেন।
তারিখ : ২৮\০১\২০২৪
স্কুলে এখন শরিফ শরিফার গল্প নিয়ে রোজ নানারকম মজার কাহিনি হয়। কোনো ছেলের সাথে ছেলেকে বা মেয়ের সাথে মেয়েকে বেশি কথা বলতে অথবা হাসাহাসি করতে দেখলে সবাই ওদের স ম কা মী বলে খেপায়। স ম কা মী শব্দটাও আমাদের শিখিয়েছেন মাহফুজ স্যার। আমাদের সপ্তম শ্রেণীতে ছেলে আর মেয়েদের ক্লাস হয় আলাদা। প্রিন্সিপাল স্যার খুব ধার্মিক মানুষ বলে ক্লাস ফাইভের পর থেকে ছেলে মেয়েদের সব ক্লাস আলাদা করে দিয়েছেন। এতে নাকি নানারকম ফিতনা এড়ানো যাবে।
কাল খুব মজার একটা ঘটনা ঘটেছে। ক্লাসভরা ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে লিমন হঠাৎ স্কুলের বাগান থেকে ছিড়ে আনা একটা গোলাপ ফুল দিয়ে প্রপোজ করেছে রাফিকে। দেখে আমরা সবাই হাসিতে ফেটে পড়তেই লিমন বললো এতে ভুল কিছু নেই। বিদেশে এরকম অহরহ হচ্ছে। আমাদের দেশেও একসময় এসবকে স্বাভাবিক চোখেই দেখা হবে।
আজকাল ক্লাসে ছেলেরা একে অন্যের সঙ্গে বেশি মিশতে সংকোচ বোধ করে। আমিও চুপচাপ থাকি। আড়াল থেকে রাফি আর লিমনের কান্ডকারখানা খেয়াল করে সবার মতো একা একা হাসি।
তারিখ : ৩\০২\২০২৪
মামুন আমাদের বাড়ির কাজের ছেলে। আম্মা বলেন ছেলের চেয়ে মেয়ে হলেই নাকি মামুনকে মানাতো বেশি। কারণ ও মেয়েদের মতো সুন্দর। বন্ধু হিসেবে মামুনকে আমারো ভালো লাগে। আগে ভাবতাম এই ভালো লাগাটা সুন্দর ফুল পাখি ভালো লাগার মতই একটা কিছু। কিন্তু মাহফুজ স্যার আমাকে অন্যরকম ভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন।
আফসার ডায়েরি বন্ধ করলেন। খেয়াল করলেন তার সারা শরীর অস্বাভাবিক হারে কাঁপছে। চোখের সামনে পৃথিবী ঘুরছে বনবন করে। শরীর টা ছেড়ে দেবার একটা উপযুক্ত স্থান খুঁজতে খুঁজতেই আফসার মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন।
.
তিন দিন পেরোলো স্কুলে যাচ্ছেন না আফসার। পাশের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক তিনি। আফসারের অসুস্থতার কথা শুনে এরমধ্যে কয়েকজন সহকর্মী দেখা করে গেছে। আজ তৃতীয় দিন। অনেক অনুরোধ উপরোধের পর রেণুর কাছ থেকে অদূর স্কুলঘরের সামনে চায়ের দোকান পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি মিলল৷
ক্ষুদ্র দোকানটাতে জনাদশেক মানুষ। ইতোমধ্যে বেঞ্চে বসার স্থান অসংকুলান। তবু আফসারকে দেখে অনেকে জায়গা ছেড়ে দিলেন। একে একে প্রত্যেকের সাথে কুশল জিজ্ঞাসার পর আফসারের জন্য স্পেশাল রঙ চায়ের হুকুম হলো। এই অজপাড়াগাঁয়ে আফসারের মতো শিক্ষিত ও সল্পভাষী মানুষের সংখ্যা কম। সবাই বলতে ভালোবাসে। কিন্তু সেই কথা শোনে মাত্র গুটিকয়েক জন। এদের মধ্যে শিক্ষিত আফসার সদাসর্বদা সংযতবাক। মাঝেমধ্যে চা আড্ডায় বসেন ঠিকি, তবে প্রয়োজনের ব্যাতিরেকে বাড়তি দুটো কথাও তার মুখ দিয়ে কেউ বলাতে পারে না।
আফসারের মলিন মুখ দেখে আজ অনেকে অনেক কথা বললেন। ক্ষণকাল পর এলেন চেয়ারম্যান বাড়ির বড় ছেলে সবুজ। তিনি আফসারের সমবয়সী এবং বন্ধুসম। জায়গা পেলেন আফসারের পাশেই। দারুণ আলাপী লোক সবুজ। সুতরাং আরেক পশলা চায়ের বৃষ্টি ঝড়ল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবুজের একখানা একাউন্ট আছে। পাড়াগাঁয়ে এই ব্যাপার টা নতুন। ফেসবুক থেকে পাওয়া নানা উদ্ভট আর মজার গল্পে আজকাল সবুজ চায়ের আসর মত্ত করেন। আজও পকেট থেকে ফোন বের করতেই সবাই উৎসুক হয়ে তাকাল। চায়ে একবার চুমুক দিয়ে অল্প অল্প হেসে সবুজ বললেন,’ মিয়াসাবরা, পৃথিবী যে কোনখানে পৌঁছায়ে গেছে আপনেরাতো সেই খবর রাখেন না। আগে বুঝতাম না, এহন বুঝি গ্রামে থাইকা বহুত ভালো আছি আমরা। বিদেশবিভুঁইয়ে যে ভয়াবহ সব ফিতনার কথা শুনি, এখনো যে তাদের ওপর আল্লাহর গযব নামে নাই সে এক বিস্ময়! সেই ফিতনার বাতাস আমাদের দেশেও আইসা পড়ছে। এইযে দেখেন, কি গভীর ষড়যন্ত্র চলতাসে এই জাতিরে ধ্বংস করার জন্য।’
একটা ভিডিয়ো ক্লিপ চালু করলেন সবুজ। যেখানে দেখা যাচ্ছে শিক্ষক ফোরামের এক সেমিনারে পাঠ্য বইয়ের পাতা ছিড়ছেন একজন শিক্ষক। শুরুটা বেশ চিত্তাকর্ষক। চায়ের কাপ হাতে প্রত্যেকে ঝুঁকে পড়লেন ফোনের স্ক্রিনে। এমনকি আফসারের পক্ষেও বেশিক্ষণ ঔদাসিন্য ধরে রাখা সম্ভব হল না। এরপরের এগারো মিনিট গোটা দোকান জুড়ে রইল পিনপতন নিরবতা। ভিডিয়ো শেষ হলে সবার মুখে গভীর কালিমার পরত পড়লো। সবচেয়ে বেশি অস্থির হলেন আফসার। সেই শিক্ষকের প্রতিটি কথা, প্রতিটি আশঙ্কা যেন তার সামনে সত্যি হয়ে ধরা দিল। কল্পচোখে আফসার দেখলেন সৈয়দ বংশের মান ডুবিয়ে তার ছেলে দিনশেষে আরেকটি ছেলেকে বিয়ে করে ঘরে এনেছে। সৃষ্টিগত ভাবে পুরুষ হয়েও রাজুর আচরণে ধীরে ধীরে চলে আসছে মেয়েলি কমনীয়তার আতিশয্য…
মাত্র কয়েক মুহুর্তের তরে দেখা দুঃস্বপ্ন। ভরা বাজারের সরগরম আড্ডায় বসে থরথরিয়ে কেঁপে উঠলেন আফসার। আশেপাশের সবাই নব্য এই ট্রা ন্স জে ন্ডা র ইস্যুটি নিয়ে কথা বলছিল। এতক্ষণে দু একটা কথা আফসারের কর্ণগোচর হলো। মুহুর্তকাল বিলম্ব না করে আফসার বিক্রম তেজে সহসা বলে উঠলেন, ‘আমরা এই দুঃস্বপ্নরে বাস্তবায়ন হইতে দিব না। হাটে বাজারে, স্কুলে সবখানে গিয়ে আমরা লোকজনরে বোঝাব। সতর্ক করবো শয়তানের এই নতুন ফিতনা সম্মন্ধে।’
নেতৃত্বের কিছু গুণ আফসারের জন্মগত ভাবে ছিল। এগ্রামের মানুষের তার প্রতি শ্রদ্ধাও অসীম। আফসারের এক ডাকে সবাই গর্জে উঠল।
‘হ আমাদের প্রতিবাদ করতে হইব।’
‘পোলাপানরে বুঝাইতে হইব, যেন তারা ধোঁকায় না পড়ে।’
‘এতবড় অপকর্ম আমরা ঘটতে দিমু না। আমরা আল্লাহর আযাবরে ভয় করি।’
‘আফসার ভাই আপনেই আমাগর ভরসা। কী করতে হইব কন। আমরা একপায়ে রাজী।’
ক্ষণকাল থমকে দাঁড়িয়ে সবার অধীরতা দেখলেন আফসার। আল্লাহ সবকিছু এতো সহজ করে দেবেন তার জন্য, এ যেন কল্পনাতীত ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর আবেগ নিয়ে তিনি শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন আল্লাহর কাছে। ঠোঁটের কোণায় ফুটল এক চিলতে আস্থার হাসি।
.
রাতে আফসার রাজুকে ডেকে পাঠালেন নিজের ঘরে। ইদানিং রাজু বাবা মায়ের সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছে। আজও ডাকার সাথে সাথে এলো না।
‘এখানে বসো রাজু।’ আফসার নিজের পাশে ছেলেকে জায়গা করে দিলেন।
‘রাজু, তুমি কি কুরআনে উল্লেখিত সব নবিগণের নাম জানো?’
‘অল্প কয়েকজনের নাম জানি।’
‘বলতো শুনি।’
‘হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মূসা আলাইহিসসালাম, ঈসা আলাইহিসসালাম, ইউসুফ আলাইহিসসালাম, নূহ আলাইহিসসালাম, ইয়াকুব আলাইহিসসালাম, ইসহাক আলাইহিসসালাম, সুলাইমান আলাইহিসসালাম, লূত আলাইহিসসালাম, হারুন আলাইহিসসালাম। আর… আর মনে পড়ছে না।’
‘বেশ বেশ। এবার জিগ্যেস করলে তাঁদের প্রত্যেকের কাহিনি আমায় শোনাতে পারবে?’
‘সবার টা পারব না।’ রাজু মাথা নিচু করল।
‘বুঝেছি’ আফসার একটু থামলেন, ‘আচ্ছা রাজু, তুমি কি লূত আলাইহিসসালামের গল্পটা জানো? কোন প্রকারের অবাধ্যতার দরুন আল্লাহ তাআলা সম্পুর্ন একটি জাতিকে আযাব দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন জানো?’
রাজু অস্বস্তি নিয়ে ওপর নিচ মাথা নাড়লো। যার অর্থ সে জানে।
‘শোনো বাবা, আমার মা একটা কথা বলতেন। আম্মা বলতেন পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার নাকি কোনো তুলনা হয়না। কিন্তু বান্দার প্রতি আল্লাহর যে অসীম ভালোবাসা, সে ভালোবাসার কাছে মায়ের ভালোবাসাও অতি সামান্য।
মায়ের কাছে সন্তানের সাত খুনও মাফ হয়। আর যিনি আরশের অধিপতি। যিনি তার বান্দাদেরকে তাদের মায়ের থেকেও বহুগুণ বেশি ভালোবাসেন, কতটা ক্রোধান্বিত হলে তিঁনি গোটা একটা জাতিকেও এক নিমিষে ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেন ভাবতে পারো?
শিরকের মতো সাংঘাতিক পাপ দুনিয়ায় থাকতেও আল্লাহ লূত আলাইহিসসালামের কওমকে আযাব দিয়েছিলেন ওদের একটিমাত্র অবাধ্যতার জন্য। ওরা ছিল স ম কা মী। তাদের বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন, “অবশেষে আমার (আল্লাহর) আদেশ চলে এলো, তখন আমি উক্ত জনপদকে ধ্বংস করে দিলাম এবং তাদের উপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করলাম।” [সূরা হুদ : ৮২]
এমনকি আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা যাদেরকে লূতের সম্প্রদায়ের অনুরূপ আচরণ করতে দেখো, সেই পাপাচারী এবং যার উপর ঐ কুকর্ম করা হয়েছে উভয়কে হ ত্যা কর।” [ইবনু মাজাহ, সনদ হাসান, মিশকাত, হাদীস নম্বর: ৩৫৭৫]
সুবহানাল্লাহ। কত ভয়াবহ অপরাধ হলে আল্লাহর রসূল এমন কথা বলেছেন!’
আফসার ছেলের দিকে তাকালেন। রাজুর মুখ নিচু। হাতদুটো তিরতির করে কাঁপছে।
স্নেহের পুত্রের জন্য হৃদয় ছেড়া কষ্ট হলো আফসারের। কিন্তু তিনি জানেন এখনো কোমল হবার সময় আসেনি। শীতল স্বরে পুনরায় বলতে আরম্ভ করলেন,’ধার্মিকের জন্য আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। এতক্ষণ আমি যা যা বললাম, পরকালে আল্লাহর বিচারের ভয় থাকলে তুমি এতেই শুধরে যাবে। তবু আর দুটো কথা বলছি।
তোমার আম্মার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছো রাজু? বজ্রাঘাত প্রাপ্তের ন্যায় দিনরাত স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। তুমি তার বড় আদরের নাড়ি ছেড়া ধন। তোমার ধ্বংস ওকে নিজ চোখে দেখতে হচ্ছে বলে ও কষ্টে মরে যাচ্ছে। এখনো কি তুমি… ‘
আফসারের শেষ বাক্য পূর্ণ হবার আগেই রাজু শব্দ করে কাঁদতে আরম্ভ করল। ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনে রেণু দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়ালেন। রাজু মাথা তুলে একপলক দেখল মাকে। তারপর ছুটে গিয়ে পা জড়িয়ে বসে পড়ল।
‘আম্মা আমি আর কখনো এমন কিছু করবো না। আমাকে মাফ করে দাও আম্মা। মাফ করে দাও।’
নিশুতির স্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে রাজুর গোঙরানি, কান্না, চিৎকার। রেণু মাটিতে ছেলের পাশে বসে পড়লেন। স্নেহভরে হাত রাখলেন মাথায়। অদূরে দাঁড়িয়ে আফসার হাসলেন স্বস্তির হাসি।
.
পনেরো জনের বিশাল একটা দল চলেছে সূর্যের হাসি উচ্চ বিদ্যালয় অভিমুখে। দলের প্রথম সারিতে আফসারের সাথে রয়েছেন চেয়ারম্যান বাড়ির বড় ছেলে সবুজ এবং তার বাবা করিমুল্লাহ চেয়ারম্যান সয়ং। প্রথমে তারা গেলেন অধ্যক্ষের কামরায়। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিটে সমস্ত ব্যাপার টি বুঝিয়ে বললেন আফসার। অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আকরাম খান সোৎসাহে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন সপ্তম শ্রেণীর কক্ষে।
আজ রাজুর মুখে অন্যরকম পরিতৃপ্তির ছায়া। বাবা বলেছেন ওর ক্লাস চলাকালীন সময়েই তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে আসবেন। জঘন্য এই ব্যাপার টি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করবেন সবার মাঝে। রাজু একবার ঘৃনার চোখে তাকালো মাহফুজ স্যারের দিকে। তার মনে হলো মিষ্টি কথার আড়ালে এই মানুষটা একজন প্রথম শ্রেণীর প্রতারক।
বাইরে হইচই শোনা যাচ্ছে। বাবা নিশ্চয়ই চলে এসেছেন। ক্লাসের বাইরে বাবার শার্টের অংশ নজরে পড়া মাত্র আনন্দে নেচে উঠল রাজুর মন।
সবার অগ্রে ছাত্রদের প্রিয় প্রিনসিপাল ক্লাসে ঢুকলেন। তার পেছনে বাকি সবাই। রাজুর বাবা বাচ্চাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষে খুব সাবলীল ভাষায় গোটা ব্যাপার টা ব্যাখ্যা করলেন। এরকম একটি মতবাদ সমাজে প্রতিষ্ঠা পেলে কী করে ধীরে ধীরে এই সমাজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে তা এত সুন্দর করে বোঝালেন যে গর্বে রাজুর বুক ফুলে উঠল। পুরো ক্লাস জুড়ে তখন মৃদু গুঞ্জন। ছাত্ররা শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এর ওর পানে। যে বিষয় টা নিয়ে ওরা এতদিন মজা কুড়িয়ে এসেছে তা যে এতটা বিধ্বংসী কিছু ওরা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি!
বক্তৃতা শেষে আফসার সবাইকে যার যার ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইটি হাতে নিতে বললেন। তারপর নিজের হাতে থাকা বইয়ের শরিফ শরিফার গল্প বিষয়ক পৃষ্ঠা দুটো বের করে ছিড়ে আলাদা করলেন বই থেকে। ছাত্রদেরকেও বললেন তাকে অনুসরণ করে পাতা দুটো ছিড়তে। ছেলেরা বেশ মজা পেল। সবাই নিজেদের বইয়ের উল্লেখিত দুই পাতা ছিড়ে রেখে এলো ময়লার ঝুড়িতে। এতক্ষণে আফসার তাকালেন নিজের পুত্রের দিকে। রাজু হাসছিল। বাবার দিকে চোখ পড়তেই দেখল সে মুখেও বিজয়ের হাসি।
______________
(সমাপ্ত)
লিখেছেন – উম্মে মারইয়াম
