পাঠ্যপুস্তকে ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদ

Share

সামাজিকভাবে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদকে বৈধতা দেওয়ার জন্য চলমান নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ ও বিকৃত যৌনতার স্বাভাবিকীকরণ। এখানে কাজ চলছে দুইটি ধারায়। একটি হল সরাসরি ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের শিক্ষা, অন্যটি হল যৌন শিক্ষার নামে অবাধ, বিকৃত যৌনতা এবং এলজিবিটি মতবাদের স্বাভাবিকীকরণ।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড NCTB-এর ২০২৩ সালের সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ে ৫১-৫৬ পৃষ্ঠায় ‘শরীফার গল্প’ শিরোনামের লেখায় সরাসরি ট্র্যান্সজেন্ডারবাদের দীক্ষা দেওয়া হয়েছে। ৫১ পৃষ্ঠায় দেয়া গল্পে মূল চরিত্র শরীফা বলছে,

“আমার শরীরটা ছেলেদের মতো হলেও আমি মনে মনে একজন মেয়ে…”

এ গল্পে শরীফা নিজেই স্বীকার করছে, ছোটবেলায় সে ছেলে ছিল। নাম ছিল শরীফ আহমেদ ।যখন আস্তে আস্তে বড় হলো তখন সেই শরীফ আহমেদই নিজেকে মেয়ে ভাবতে শুরু করলো এবং মেয়েদের মতো আচরণ করতে লাগলো। আর এটাই তার ভালো লাগে। ৫২ পৃষ্ঠায় মূল চরিত্র শরীফাকে একজন বলছে,

“…আমরা নারী বা পুরুষ নই। আমরা হলাম ট্র্যান্সজেন্ডার।”

একই বইয়ের ৫৩ পৃষ্ঠায় নতুন প্রশ্ন অনুচ্ছেদে পাঁচজন শিক্ষার্থীর কথোপকথনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই কথোপকথনে এক শিক্ষার্থী বলছে তার মা তাকে শিখিয়েছে,

‘…ছোটদের কোনো ছেলে-মেয়ে হয় না। বড় হতে হতে তারা ছেলে বা মেয়ে হয়ে ওঠে।’

৫৫ এবং ৫৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,

“আমরা যে মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখেই কাউকে ছেলে বা মেয়ে বলছি, সেটা হয়তো সবার ক্ষেত্রে সত্যি নয়।”

“..এখন বুঝতে পারছি, ছেলে-মেয়েদের চেহারা, আচরণ, কাজ বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের কোনো স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নেই।” 

“..একটি শিশু যখন জন্ম নেয় তখন তার শরীর দেখে আমরা ঠিক করি সে নারী নাকি পুরুষ। এটি হলো তার জৈবিক লিঙ্গ পরিচয়। জৈবিক লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে একজন মানুষের কাছে সমাজ যে আচরণ প্রত্যাশা করে তাকে আমরা ‘জেন্ডার’ বা ‘সামাজিক লিঙ্গ’ বলি। জৈবিক লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে তার জেন্ডার ভূমিকা না মিললে প্রথাগত ধারণায় বিশ্বাসী মানুষেরা তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।”

কথাগুলো সরাসরি পশ্চিমা বিশ্ব থেকে আমদানী করা ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ এবং জেন্ডার আইডেন্টিটি মতবাদের বক্তব্য। আত্মপরিচয় এবং যৌনতা নিয়ে বিকৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে নিতে শেখানো হচ্ছে আমাদের শিশুদের।

বইয়ের এ অংশ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে ২০২৪ সালের সংস্করণে ট্র্যান্সজেন্ডার শব্দটা বাদ দেয়া হয়, কিন্তু মূল বক্তব্য একই থাকে। ২০২৪ সালের বইয়ে শরীফার গল্প এসেছে ৩৯-৪৪ পৃষ্ঠায়। ৪০ পৃষ্ঠায় এখনো বলা হচ্ছে-

“আমার শরীরটা ছেলেদের মতো হলেও আমি মনে মনে একজন মেয়ে…”

সেই একই ছোটবেলায় ছেলে, তারপর নিজেকে মেয়ে ভাবা, শরীফ থেকে শরীফা হওয়ার গল্প শোনানো হয়েছে নতুন বইয়েও।

৪২ এবং ৪৪ পৃষ্ঠায় বাচ্চাদের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে,

‘আমরা যে মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখেই কাউকে ছেলে বা মেয়ে বলছি, সেটা হয়তো সবার ক্ষেত্রে সত্যি নয়।’

অর্থাৎ, একজন মানুষ পুরুষের শরীর নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও সে যদি কোনো এক বয়সে নিজেকে নারী দাবী করে তাহলে সে নারী। আবার নারী দেহ নিয়ে জন্মগ্রহণ করা কেউ যদি নিজেকে পুরুষ দাবী করে তাহলে সে পুরুষ। যতোক্ষণ না অন্যের কোনো ক্ষতি হচ্ছে ততোক্ষণ যা খুশি তা-ই করা যায়। চাইলেই লিঙ্গ পরিবর্তন করা যায়। আর যারা এটা মেনে নেবে না তারা সেকেলে, পশ্চাৎপদ।  

পাঠ্যবইয়ে এই মতবাদ আসলো কিভাবে?

পাঠ্যবইয়ে ট্র্যান্সজেন্ডার মতবাদ ঢোকানোর পেছনে নিজেদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি তাদের ২০২১ সালের বাৎসরিক প্রতিবেদনে লিখেছে,

“পলিসি অ্যাডভোকেসি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বন্ধু তাই একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে এনসিটিবির সাথে সংলাপ শুরু করেছে...”

সেই নির্দিষ্ট এজেন্ডা কী? উত্তর একটু পরেই দেয়া হয়েছে,

“…এভাবেই অবশেষে কম্প্রিহেনসিভ যৌন শিক্ষা জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে…এটি সরাসরি বন্ধু-র দীর্ঘমেয়াদী অ্যাডভোকেসির ফল। বন্ধু বিশ্বাস করে হিজড়া এবং ট্র্যান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের অধিকার ও প্রয়োজনসংক্রান্ত সমস্যাগুলো শীঘ্রই শিক্ষাক্রমে প্রতিফলিত হবে, এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে চলমান…”

আসলেই খুব দ্রুত তাদের এই ‘বিশ্বাস’ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ২০২২ সালের বাৎসরিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন এবং এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টরের লেখায় বলা হচ্ছে-

“জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সাথে দৃঢ় লবিয়িং এবং অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে, ট্র্যান্সজেন্ডার, হিজড়া এবং লিঙ্গ রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একটি বিস্তারিত (কম্প্রিহেনসিভ) অংশ সপ্তম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”

একই প্রতিবেদনের ৯ নং পৃষ্ঠায় বলা হচ্ছে, এই আলোচনাগুলো এসেছে ‘ক্লাস ৭ এর সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে’।

অর্থাৎ পাঠ্যবইয়ে এলজিটিভি মতবাদ নিয়ে আসার জন্য বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামের প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ থেকে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, এনসিটিবি-র সাথে ‘টেনেশাস লবিয়িং’ করে এ বিষয়গুলো তারা ক্লাস সেভেনের সামাজিক বিজ্ঞান বইতে এনেছে।

যৌন শিক্ষা ও এলজিবিটি:

পাঠ্যপুস্তকে ট্র্যান্সজেন্ডার আনার পক্ষে ওকালতির কাজটা শুধু বন্ধু করছে না, এর সাথে আছেও অন্যান্য এনজিও এবং এলজিবিটি সংগঠন। এরা বহু বছর ধরে যৌন শিক্ষার নামে বিকৃত যৌনতার দীক্ষা পাঠ্যপুস্তকে আনার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত।

ইউনিসেফসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও-দের ক্রমাগত চাপে ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষার অংশ যুক্ত করা হয়। এসব অংশ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে অভিভাবক, সাধারণ জনগণ এমনকি শিক্ষকরাও। প্রতিবাদের মুখে ২০১৪/১৫ সালে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

কিন্তু সন্তুষ্ট হয় না পশ্চিমারা। ২০১৬ সালে সুইডেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিডা (SIDA), আঞ্চলিক নারীবাদী এনজিও অ্যারো (ARROW), এবং দেশীয় নারীবাদী এনজিও ‘নারীপক্ষ’-এর যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যৌন শিক্ষার অবস্থা নিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে ‘সহায়তা’ দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

এ প্রতিবেদনে পাঠ্যবইগুলোর যৌন শিক্ষা অংশের বেশ কিছু দিকের সমালোচনা করা হয়েছে, যেমন

  • বইগুলোতে পর্নোগ্রাফি দেখার মতো কাজগুলো সমাজের জন্য হুমকি বলা হয়েছে,
  • মাদ্রাসা বোর্ডের বইতে বলা হয়েছে যিনা, সমকামিতা হারাম
  • বলা হয়েছে যৌনতা কেবল স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে হতে পারে

লক্ষ্য করুন, এনজিও-দের বানানো প্রতিবেদনে এই অবস্থানগুলোর সমালোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের মতে যৌন শিক্ষার মাধ্যমে শিশুকিশোরদের শেখানো উচিৎ যে, পর্নোগ্রাফি সমাজের জন্য হুমকি না, যিনা এবং সমকামীতা নিষিদ্ব কিছু না, আর যৌনতা কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হতে হবে এমন কোন কথা নেই। যৌন শিক্ষা কারিকুলামের ব্যাপারে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ‘ইসলামী উগ্রবাদের’ সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এ প্রতিবেদনের লেখিকা!

একই সুরে, ব্র্যাকের তৈরি ২০১৮-এর এক প্রতিবেদনে সমালোচনা করা হয়েছে এই কারিকুলামের।

কারিকুলামটিকে অপূর্ণ বলা হয়েছে, কারণ এতে,

  • হস্তমৈথুন সংক্রান্ত আলোচনা নেই
  • জেন্ডার আইন্ডিন্টিটি (ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ) সংক্রান্ত আলোচনা নেই
  • বিবাহপূর্ব যৌনতা নিয়ে আলোচনা নেই

ব্র্যাকের মতে এগুলোও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা দরকার।

তারপর ব্র্যাকের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থায় সঠিকভাবে যৌন শিক্ষা দেয়া না হলেও ১৩টি এনজিও যথাযথভাবে পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপসান অনুযায়ী ‘যৌন এবং প্রজনন স্বাস্ত্য ও অধিকার’ (অর্থাৎ বিকৃত যৌনতার বৈধতা ও সামাজিকীকরণে) নিয়ে শিক্ষা দিচ্ছে। অর্থাৎ সমকামিতা, ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ তথা অবাধ ও বিকৃত যৌনতার শিক্ষা দিচ্ছে এই ১৩টি এনজিও। অনেকে ক্ষেত্রে এসব ‘শিক্ষা’ দেয়া হচ্ছে ইনফরমালি/অনানুষ্ঠানিকভাবে অন্য আলোচনার অংশ হিসেবে। ব্র্যাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,

অন্যান্য আনুষ্ঠান সেবা যেমন, পরিবার পরিকল্পনা, নিরাপদ জন্ম, বয়ঃসন্ধি সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সেবা, এর সাথে কম্প্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন/ যৌন এবং প্রজনন স্বাস্ত্য ও অধিকার সংক্রান্ত শিক্ষা যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে, এতে করে এসব বিষয়ের সাথে জড়িত সামাজিক নেতিবাচক মনোভাব এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

২০২৩ সালে জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউয়ের জন্য জমা দেয়া প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের পাঠ্যপুস্তক এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে বিরোধিতার ব্যাপারটাও উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,

২০২৩ সালের জানুয়ারীতে প্রবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের স্কুলগুলিতে CSE (কম্প্রিহেনসিভ যৌন শিক্ষা) পাঠ্যক্রমকে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দ্বারা হালনাগাদ করে নতুন শিক্ষাক্রমটি চালু করা হয়েছিল জেন্ডার স্টেরিওটাইপস, যৌনতা সম্পর্কিত নেতিবাচক মনোভাব, প্রজনন, যৌনতা, যৌন আচরণ, লিঙ্গ, এবং যৌন ও লিঙ্গ বৈচিত্র্য -এর মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে কিশোর-কিশোরীদের ধারণা ও বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে সহায়তার জন্যে।

অর্থাৎ ২০২৩ এর পাঠ্যবইয়ে যৌন শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে পশ্চিমা সংস্থা, এবং দেশী-বিদেশী এনজিওগুলোর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। এ প্রতিবেদনের একটু পরেই বলা হয়েছে,

নতুন পাঠ্যপুস্তক এবং সিএসই পাঠ্যক্রম কিছু বিরোধিতা এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। যেমন, সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের “লিঙ্গ বৈচিত্র্য, লিঙ্গ পরিচয় এবং লিঙ্গ ভূমিকা” অংশের কিছু আলোচনা নিয়ে ইসলামপন্থী, রক্ষণশীল এবং সমাজের চরমপন্থী অংশগুলির দিক থেকে ব্যাপক বিরোধিতা দেখা দেয়। তারা বিশ্বাস করে যৌন শিক্ষার কিছু সেনসেটিভ বিষয়বস্তু (যেমন যৌন আনন্দ, সম্মতি, সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার এবং ট্রানজিশন ইত্যাদি)কিশোর-কিশোরীদের চিন্তাকে কলুষিত করছে।

এই প্যারাগ্রাফের বক্তব্যের দুটি দিক লক্ষ্যনীয়।

  • প্রথমত, তারা স্বীকার করছে এসব আলোচনার মাধ্যমে সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার অর্থাৎ এলজিবিটি মতবাদের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে
  • দ্বিতীয়ত, এর বিরোধিতাকে তারা ইসলামপন্থা এবং চরমপন্থার সাথে যুক্ত করেছে। আপনি যদি এলজিবিটি মতবাদের বিরোধিতা করেন তাহলে আপনি চরমপন্থী!

জাতিসংঘের মাধ্যমে এলজিবিটির সামাজিকীকরণ ও আইনী বৈধতার ব্যাপারে বাংলাদেশকে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল সেগুলোর ব্যাপারে এই প্রতিবেদনের বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ,

এলজিবিটি সম্প্রদায়ের অধিকার সম্পর্কিত সুপারিশের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং নৈতিক বিষয়। (তবে) এসব সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বৈচিত্র্যময় যৌন রুচি এবং লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নীতি নিশ্চিত করতে সরকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্রমে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে।

ওপরের কথাগুলো সহজ করে বলি-

বৈচিত্রময় যৌন রুচি = বিকৃত যৌনতা

বৈচিত্রময় লিঙ্গ পরিচয় = শারীরিকভাবে সুস্থ নারী সাজা পুরুষ বা পুরুষ সাজা নারী (ট্রান্সজেন্ডার)

যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার = বিকৃত যৌনতার বৈধতা ও সামাজিকীকরণ

অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে এলজিবিটির বৈধতা ও সামাজিকীকরণের জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে, এবং সরকারের পক্ষ থেকে আংশিকভাবে এটা বাস্তবায়ন হচ্ছে। এজন্যই শিক্ষাক্রমে যৌন শিক্ষা ও ট্র্যান্সজেন্ডারবাদ নিয়ে আলোচনা যুক্ত করা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনের শেষে আবারও দণ্ডবিধির ৩৭৭ অনুচ্ছেদ বাতিল করতে এবং এলজিবিটিকে সামাজিক ও আইনী বৈধতা দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কাজেই পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্যপুস্তকে শরীফার গল্প আর যৌন শিক্ষার আলোচনাগুলো বৈশ্বিক এলজিবিটি এজেন্ডার অংশ, এ নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

সবশেষে এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে কারা কাজ করেছে সেটাও জানিয়ে দেই।

প্রতিবেদনের মূল উদ্যোক্তা হল অ্যারো, রাইট হেয়ার রাইট নাও এবং সেক্সুয়াল রাইটস ইনিশিয়েটিভ। তিনটাই আন্তর্জাতিক এনজিও।আর বাংলাদেশ থেকে এই প্রতিবেদন তৈরিতে সাহায্য করেছে, এবং এই প্রতিবেদনকে সমর্থন (এনডোর্স) করেছে, ব্র্যাক, নারীপক্ষ, নাগরিক উদ্যোগ, আরএইচএসটিইপি এবং অবয়ব। সবগুলো দেশী এনজিও।

সহযোগীদের তালিকায় থাকা ‘অবয়ব’ হল বয়েস অফ বাংলাদেশের নতুন নাম। বয়েস অফ বাংলাদেশ ২০১৮ সালের দিকে অবয়ব – ডাইভার্সিটি সার্কেল নামে কাজ শুরু করে।

আরও মজার তথ্য হলো, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকিউমেন অ্যাকাডেমি ২৩ জন বাংলাদেশী ‘চেইঞ্জমেকার’ হিসেবে মনোনীত করে। এই ২৩ জনের একজন হল তানভীর আলিম, অবয়বের অপারেশনস লীড।

অ্যাকিউমেন একটি অ্যামেরিকান এনজিও। পাঠকের হয়তো মনে আছে, এই একই ব্যক্তি ২০১৩ সালে বয়েস অফ বাংলাদেশে প্রতিনিধি হিসেবে এবং বৈশ্বিক এলজিবিটি সংগঠন ইলগার পক্ষ হয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে বাংলাদেশের ব্যাপারে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিল।

এভাবে পশ্চিমাদের পরিকল্পবা ও অর্থায়নে বাংলাদেশে চলছে এলজিবিটি এজেন্ডার প্রচার ও প্রসার। এমন আরও অনেকটা ঘটনা ঘটেছে, ঘটছে, তার অল্প কিছু আমরা তুলে ধরছি,

  • ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ নামে একটি এলজিবিটি সংগঠনের সদস্য কামাল হোসেন শিশির ওরফে তাসনুভা আনাম ইলগা নামের আন্তর্জাতিক এলজিবিটি সংগঠনের বোর্ডের সদস্য হয়েছে। নিজেকে এখন ট্র্যান্সজেন্ডার নারী পরিচয় দেয়া কামাল হোসেন অতীতে কাজ করেছে সমকামী পুরষদের সংগঠন রূপবান, অবয়ব (বয়েস অফ বাংলাদেশ), এবং বন্ধু-এর সাথে। বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাসের ফেইসবুকে পেইজে লেখা হয়েছে, তাসনুভাকে নিয়ে গর্বিত মার্কিন দূতাবাস।
  • বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ফর্মে নারী ও পুরুষের সাথে ট্র্যান্সজেন্ডার ঘর যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গ ব্যবহার করা হয়নি।
  • রাইট হিয়ার, রাইট নাও নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইয়ুথ পলিসি ফোরামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে এলজিবিটির পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে ‘যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ এর ব্যানারে। এ প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউয়ের জন্য প্রতিবেদন তৈরিতে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিল।
  • ২০২৩ এর এপ্রিলে জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ১০টি সমকামী সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে বয়েস অফ বাংলাদেশ। এখানে আবারও দণ্ডবিধির ৩৭৭ অনুচ্ছেদ বাতিলের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে যৌন বিকৃতির বিরুদ্ধে বক্তব্যকে আইন করে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে কোন ধরনের শারীরিক পরীক্ষা ছাড়া হিজড়া ও ট্র্যান্সজেন্ডার হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ করে দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

উপসংহার:

শুরু থেকে বাংলাদেশে এলজিবিটি কার্যক্রম চলছে একটি পশ্চিমা প্রকল্প হিসেবে। যেখানে এনজিও-রা পশ্চিমাদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। এদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছে কিছু সুবিধাবাদী মধ্যস্বত্বভোগী লোকজন, কিছু পশ্চিমা দালাল, কিছু সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট।


Share