২০১০ সালে বইমেলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনী থেকে বের হয় কুখ্যাত মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অ্যামেরিকা প্রবাসি ইসলামবিদ্বেষি অভিজিৎ রায়ের বই ‘সমকামিতা’। অভিজিৎ রায় তার এই বইয়ে বিজ্ঞানের জগাখিচুড়ি ব্যাখ্যা, এবং নানা লজিকাল ফ্যালাসি ব্যবহার করে সমকামিতা-কে স্বাভাবিক মানবিক আচরণ হিসেবে প্রমানের চেষ্টা করে। তার অন্যান্য লেখার মতো এই লেখাটিও ছিল বিভিন্ন পশ্চিমা লেখকের লেখার ছায়া অনুবাদ। ২০১০ সালে অগাস্টে অভিজিৎ রায়ের বইটির রিভিউ প্রকাশ করে প্রথম আলো। বিশাল এক পাঠকশ্রেণীর ড্রয়িং রূমে সমকামিতার মতো জঘন্য বিকৃতির সাফাই পৌছে যায় প্রায় সবার অলক্ষ্যে।[13]
এই বই প্রকাশিত হবার পর বয়েস অফ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অভিজিৎ রায়ের সাথে দেখা করে। একই বছর ধানমন্ডির জার্মান ইন্সটিটিউটে আন্ডার দা রেইনবো নামের একটি এলজিবিটি উৎসব আয়োজন করা হয়। পরের দুই বছরেও এ ‘উৎসব’ আয়োজিত হয়।
২০১৩ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক এলজিবিটি নেটওয়ার্কের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায় বয়েস অফ বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ইকোসকের উপদেষ্টা মর্যাদা পাওয়া ইলগার এশীয় শাখার সদস্য পদ পায় তারা। ২০১৩ এর ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে ইলগার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ব্যাপারে বক্তব্য উপস্থাপন করে বয়েস অফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি তানভীর আলিম।
এ বছর আবারও জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউতে বাংলদেশ সরকারকে ৩৭৭ নম্বর সেকশন বাতিল করতে বলা হয়। বাংলাদেশ এ সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে এই সুপারিশ গ্রহণযোগ্য না।
সমকামী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সরকারের এ অবস্থানের সমালোচনা করে আইন ও সালিশ কেন্দের মতো সংস্থাগুলোও। ভারতীয় পত্রিকা ডিএনএ ইন্ডিয়াকে দেয়া সাক্ষাকারে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অ্যাক্টিভিস্ট বিনা ডি কস্টা বলেন,
“বাংলাদেশের সরকার মৃত্যুদণ্ড বাতিল এবং দণ্ডবিধির ৩৭৭ অনুচ্ছেদ বাতিল করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহন করতে রাজি হয়নি, এতে আমরা হতাশ।”
এরপর এপ্রিল ও মে মাসে ব্র্যাক জেইমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ আর বয়েস অফ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে দুটি গোলটেবিল বৈঠক হয়। বাংলাদেশে এলজিবিটি অধিকার আন্দোলনকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, আলোচনা হয় তা নিয়ে। এ অনুষ্ঠানে সমকামী সংগঠনগুলোর সদস্য এবং ব্র্যাকের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন দূতাবাস এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও।
২০১৪ সালে সমকামীতাদের সামাজিকীকরণের জন্য মার্কিন সরকারের স্টেইট ডিপার্টমেন্টের অর্থায়নে ‘প্রজেক্ট ধী’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করে বয়েস অফ বাংলাদেশ। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে মুন্সিগঞ্জের একটি রিসোর্টে দুই দিন ব্যাপী ‘ধী রেসিডেন্সি’ নামের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।দেশের সমকামীতাদের সামাজিকীকরণ নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এই কর্মশালায়।
অক্টোবরে ধী- নামে কমিক প্রকাশ করে বব, যে কমিকের প্রধান চরিত্র একজন সমকামী নারী। এই কমিকের মোড়ক উন্মোচন হয় ব্রিটিশ কাউন্সিলে। ডেইলি স্টার এবং ডয়েচ ভেলের মত মিডিয়াগুলো ইতিবাচকভাবে নিউজ করে অনুষ্ঠানটি নিয়ে। প্রজেক্ট ধী-র অংশ হিশেবে ২০১৬ নাগাদ দেশের ১৩টি জেলায় অনুষ্ঠান আয়োজন করে বয়েস অফ বাংলাদেশ।
বয়েস অফ বাংলাদেশ এবং এ ধরণের সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের পরিধি ও প্রভাব কেমন ছিল সে ব্যাপারে একটা ধারণা পাওয়া যায় ২০১৮ সালে দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে। ঢাকায় সমকামী ক্লাব শিরোনামের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
“ইদানীং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সমকামীরা ক্লাব খুলে তাদের কাজ করছে। কেউ কেউ এক সঙ্গে থাকছে। এমন একাধিক সমকামী সংগঠনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এসব সংগঠন গোপনে চালাচ্ছে কার্যক্রম। কিছু এনজিও দিচ্ছে তাদের সহায়তা। ফেসবুক, টুইটার, ইমো, হোয়াটস অ্যাপসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে এরা এখন সরব। সাংকেতিক কোড ব্যবহার করে বাড়াচ্ছে সদস্য সংখ্যা। সদস্য সংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি করবে তারও ট্রেনিং দেয়া হয় এখানে।”
২০১৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর বৃটিশ কাউন্সিলে একটি সমকামী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেদিন ২০০-এর বেশি সমকামী তরুণ-তরুণী জড়ো হয়েছিল। যেখানে ‘ধী’ নামে একটি সমকামী কমিক উপস্থাপন করা হয়েছিল। আর এর চরিত্র ধারণ করেছিলেন দেশের খ্যাতনামা এক সাংস্কৃতিক দম্পতির মেয়ে। সেদিনকার সমাবেশে সমকামীদের অধিকারের পক্ষে ‘নিজেরা করি’ এনজিওর সমন্বয়কারী নানা কথা বলেছিলেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বৃটিশ কাউন্সিলের সমকামীদের সে সমাবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। এর আগে ২০১৩ সালের ২৯শে এপ্রিল জেনেভায় অনুষ্ঠিত ‘ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউতে’ তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমকামীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলায় দেশে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ২০১৭ সালের আগস্টে কেরানীগঞ্জ থেকে এক গোপন বৈঠক চলাকালে ২৮ সমকামীকে পুলিশ আটক করে। এ ঘটনা নিয়েও দেশজুড়ে তোলপাড় হয়।”
ঢাকায় সমকামী ক্লাব, দৈনিক মানবজমিন
২০০৯ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে বয়েস অফ বাংলাদেশের আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কর্মকান্ডের তালিকা (তাদের সাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী) নিচে দেয়া হল –
- ২০০৯ সালে সাহরা (South Asian Human Rights Association for Marginalized Genders and Sexualities-SAHRA) নামে একটি আঞ্চলিক এলজিবিটি প্ল্যাটফর্মের সদস্য হয় বয়েস অফ বাংলাদেশ।
- ২০১১ সালে বব এবং বন্ধু যৌথভাবে বাংলাদেশে সাহরার মিটিং আয়োজন করে।
- জার্মান কালচারাল ইন্সটিটিউট এবং অলিয়স ফ্রসেজে এলজিবিটি নিয়ে বেশ কিছু শিল্প প্রদর্শনী ও ‘ফেস্টিভাল’ আয়োজন ও অংশগ্রহণ করে।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগামের এশিয়ান উইমেনস ইউনিভার্সিটিতে একাধিকার প্রেসেন্টেশান দেয় এবং সেমিনারে অংশগ্রহণ করে।
- বাংলাদেশে হিউম্যান রাইটস ফোরামের সদস্যপদ লাভ।
- সমকামীতার ওপর একটি ব্রোশিয়ার প্রকাশ (২০১৩)।
- প্রনয়নামা নামে দুটি আবৃত্তি অনুষ্ঠান আয়োজন।
- সমকামীতার পক্ষে যাদুর শহর নামে মঞ্চ নাটক আয়োজন।
- এলজিবিটি নিয়ে আয়োজিত ব্র্যাকের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ।
- সমকামী ফিল্ম ফেস্টিভাল নিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাথে যৌথ আয়োজন ।
- বাংলাদেশের সমকামীরা যেন সহজে যৌন সঙ্গী খুঁজে বের করতে পারে তার জন্য সমকামীদের আন্তর্জাতিক ডেইটিং অ্যাপ (যৌন সঙ্গী খুঁজে বের করার জন্য তৈরি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন)-এর সাথে কোলাবরেশন।
- সমকামীদের ‘আইনী ক্ষমতায়ন’ নিয়ে ব্ল্যাস্টের সাথে কাজ করা।
- বয়েস অফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি (শওকত ইমাম রাজীব) ২০১৫ সালে ইলগা এশিয়ার বোর্ডের সদস্য মনোনীত হয়।
- ২০১৬ সালে বয়েস অফ বাংলাদেশ বাংলাদেশে সমকামীতার বৈধতা ও সামাজিকীকরণের লক্ষ্যে ৫ বছরের একটি স্ট্র্যাটিজিক পরিকল্পনা প্রস্তুতের জন্য ময়মনসিংহে ওয়ার্কশপ আয়োজন করে বব।
রূপবান:
ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহকে কাজে লাগিয়ে এবং বয়েস অফ বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে গড়ে ওঠে আরও কিছু সমকামী সংগঠন। ২০০৮ এ Queer Bangla এবং Gay Bangla নামে দুটো সংগঠন তৈরি হয়, যদিও কোনটাই ঐভাবে স্থায়ী হয় না।
তবে সক্রিয় হয় রূপবান নামে আরেকটি উদ্যোগ। ২০১১ থেকে নেটওয়ার্কিং শুরু করলেও রূপবান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ২০১৪ সালে ‘রূপবান’ নামে দেশের প্রথম সমকামী ম্যাগাযিন প্রকাশের মাধ্যমে।

এই ম্যাগাযিনের প্রচারণা চলে প্রিন্ট মিডিয়া (যেমন ডেইলি স্টারে বিজ্ঞাপন দেয়ার মাধ্যমে) এবং অনলাইনের মাধ্যমে। ব্রিটিশ কাউন্সিলে অনুষ্ঠিত রূপবানের প্রথম সংখ্যার প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয় তৎকালীন ব্রিটিশ হাই-কমিশনার রবার্ট গিবসন, ব্যারিস্টার সারা হোসেনসহ আরো অনেকে।
ম্যাগাযিনটির প্রকাশনার খবর ফলাও করে প্রচার করে ডেইলি স্টার, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন, বিবিসি সহ বিভিন্ন পত্রিকা ও গণমাধ্যম। বরাবরের মতো এখানেও ছিল পশ্চিমা কানেকশন। রূপবানের প্রধান উদ্যোক্তা জুলহাস মান্নান ছিল মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা, তার সম্পর্ক ছিল ছিল ইউএসএইডের সাথেও।
বয়েস অফ বাংলাদেশের সাথে মিলে বাংলাদেশের সমকামীদের নিয়ে একটি জরিপ চালায় রূপবান। দাবি করে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১০ শতাংশ নাকি সমকামী! এই হাস্যকর দাবি পরবর্তীতে বিদেশী এনজিও, পশ্চিমা সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনগুলোতে বারবার ব্যবহার করবে। বয়েস অফ বাংলাদেশের মতো রূপবানও সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট তৈরির জন্য দেশজুড়ে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ আয়োজন করে রূপবান ইয়ুথ লিডারশীপ প্রোগ্রাম নামে।
তবে প্রকাশ্য কর্মকান্ডের দিক থেকে বয়েস অফ বাংলাদেশকে বেশ অনেকটা ছাড়িয়ে যায় রূপবান। ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে রঙধনু র্যালি আয়োজন করে রূপবান। শাহবাগে রংবেরঙের পোশাক পরে মিছিল করে হিজড়া এবং সমকামী পুরুষরা। এ সময়টাতে রূপবান দুটি ‘ফ্যাশন শো’ ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে যেগুলোর মূল থিম ছিল ট্র্যান্সজেন্ডার ও ক্রসড্রেসিং, অর্থাৎ সমকামী পুরুষদের নারীর পোশাকে সাজা।


জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা জুলহাস মান্নান ও তার সহগামী মাহবুবকে ২০১৬ সালে হত্যা করার পর রূপবানসহ স্তিমিত হয়ে আসে অন্যান্য সমকামী সংগঠনের কার্যক্রম।
অনেক অ্যাকটিভিস্ট দেশ ছেড়ে চলে যায়। প্রায় বন্ধ হয়ে যায় সমকামী অধিকার নিয়ে প্রকাশ্য কার্যক্রম।
তথ্যসূত্র : আসিফ আদনান
