ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ কি?
ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ হলো, যার মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গবোধ জন্মগত লিঙ্গ চিহ্ন থেকে আলাদা।
এ মতবাদ অনুযায়ী, শারীরিক গঠনে সুস্থ স্বাভাবিক কোনো পুরুষ যদি নিজেকে নারী মনে করে, তাহলে সে নারী। অনুরূপভাবে শারীরিক গঠনে সুস্থ স্বাভাবিক কোনো নারী যদি নিজেকে পুরুষ মনে করে, তাহলে সে পুরুষ। অর্থাৎ জন্মগত লিঙ্গ দিয়ে নারী-পুরুষ চিহ্নিত করা হবে না; বরং নারী-পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মাধ্যম হবে মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গবোধ। নিজেকে যা মনে করবে সে তা-ই হবে।
এ মতবাদে ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার জন্য সার্জারির মাধ্যমে বা হরমোন থেরাপির মাধ্যমে শারীরিক কাঠামো পরিবর্তন করা আবশ্যক নয়, করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে। সর্বাবস্থায়ই সে ট্রান্সজেন্ডার।
ইসলামের দৃষ্টিতে ট্রান্সজেন্ডার
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
‘আমি (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে।’ (সুরা : ত্বিন, আয়াত : ৪)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে স্বাভাবিক দেহাবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেটাই তার জন্য উৎকৃষ্ট নিয়ামত। একে পরিবর্তন/পরিবর্ধনের অধিকার কারও নেই। লিঙ্গ পরিবর্তন ইসলামে জঘন্যতম হারাম ও কবিরা গুনাহ।
পুরুষকে আল্লাহ যে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করছেন, তা সেভাবেই বজায় রাখা এবং নারীকে যে নারীত্বের বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা-ও সেভাবে বজায় রাখাই আল্লাহর বিধান।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,
‘রাসুল (সা.) নারীর বেশধারী পুরুষদের এবং পুরুষের বেশধারী নারীদের অভিসম্পাত করেছেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৫)
সব ইসলামী আইনবিদ এ বিষয়ে একমত যে ট্রান্সজেন্ডার হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিতে বিকৃতিসাধন, যা সুস্পষ্ট হারাম। আবার অনেকের ভাষ্য মতে এটি কুফরি।
রাসূল (সা:) বলেছেন,
”আল্লাহ সেসব মানুষদের উপর অভিসম্পাত করেছেন যারা তাঁর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনে।” (বুখারি: ৪৮৮৬)
হিজড়া কি?
’হিজড়া’ হলো জন্মগত দৈহিক ত্রুটি নিয়ে যারা জন্মগ্রহণ করে।এক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
হিজড়া ( আরবীতে খুনসা) যেহেতু নারী অথবা পুরুষ থেকে ভিন্ন কোনো শ্রেণি নয় তাই ‘হিজড়া’ সম্পর্কে মূল কথা হলো, সে কি পুরুষ, না নারী তা আগে যাচাই করতে হবে।
তার দেহে বিদ্যমান চিহ্নগুলোর মাধ্যমে নির্ণয় করা হবে যে, কোন হিজড়ার মধ্যে পুরুষের মূল চিহ্ন কিংবা পুরুষের অধিকাংশ চিহ্ন বিদ্যমান এবং কোন হিজড়ার মধ্যে নারীর মূল চিহ্ন কিংবা নারীর অধিকাংশ চিহ্ন বিদ্যমান। এর ভিত্তিতেই সে পুরুষ নাকি নারী সেটি নির্ধারণ করা হবে।
যার দেহে পুরুষ ও নারী উভয়েরই অঙ্গ রয়েছে তার লিঙ্গ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি হলো, তার দেহে শুক্রাশয় আছে না ডিম্বাশয়, মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে তা নির্ণয় করা। যদি শুক্রাশয় থাকে তাহলে সে পুরুষ আর যদি ডিম্বাশয় থাকে তাহলে সে নারী।
ইসলামের দৃষ্টিতে হিজড়া
হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের ইসলাম কখনো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়নি বরং ইসলাম মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে এবং নামাজের জামাতসহ সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ অনুমোদন করেছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
‘তিনি (আল্লাহ) মাতৃগর্ভে তোমাদের যেমন ইচ্ছা তেমন রূপ দেন।
(সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ৬)
সুতরাং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করার অর্থ হলো আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ । তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা, খারাপ মন্তব্য করা মারাত্মক গোনাহের কাজ। যেকোনো মুসলমানকে গালি দেয়া যেমন পাপ তাদের গালি দেয়া তার চেয়ে বেশি পাপ। কোন মুসলমানকে তাচ্ছিল্য করা যেমন পাপ তাদেরকে তাচ্ছিল্য করা এর চেয়ে কম পাপ নয় বরং আরো বেশি পাপ। কারণ তাদের এ দুর্বলতার কারণে তাদের ঠাট্টা করা মানে হল আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকে ঠাট্টা করা। আল্লাহর সৃষ্টিকে হাসি তামাশার বিষয় বানানো। তাই এটি খুবই গর্হিত গোনাহের কাজ।
ইসলামে হিজড়াদের নামাজ, রোজা, পর্দা,সম্পদের উত্তরাধিকার ইত্যাদি সবকিছু তারা কোন লিঙ্গ এর অন্তর্ভূক্ত সেটা নির্ধারণ করে সেই অনুসারে পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইসলাম অনুযায়ী হিজড়াদের বিবাহের বিধান
হিজড়াকে যদি কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় আর উক্ত পুরুষের জন্য তার সাথে সহবাস করা সম্ভব হয়, তাহলে উক্ত বিবাহ বহাল থাকবে। এমনিভাবে সে যদি কোনো নারীকে বিবাহ করে এবং সে নারীর সাথে সহবাস করতে সক্ষম হয় তাহলেও বিবাহ বহাল থাকবে। আর যদি সে সহবাসে সক্ষম না হয় এবং স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হয়, তাহলে আদালত স্বামীকে এক বছর সময় দিবে। উক্ত সময়ের মধ্যেও যদি সে সহবাসে সক্ষম না হয় তাহলে আদালত তাদের মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদ করে দিবে।
(কিতাবুল আসল লি-ইমাম মুহাম্মদ ৯/৩২৩, আলমউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আলকুওয়্যাইতিয়্যাহ ২০/২৭)
ইসলাম অনুযায়ী হিজড়াদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিধান
ইসলাম অনুযায়ী হিজড়ারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাবে। তারা কোন লিঙ্গ এর অন্তর্ভূক্ত সেটা নির্ধারণ করে সেই অনুসারে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারিত হবে।
পুরুষ হলে ছেলে হিসেবে আর নারী হলে মেয়ে হিসেবে মিরাস বা বাবার সম্পত্তি পাবে।
তবে যদি খুনছায়ে মুশকিল হয়, নারী না পুরুষ বুঝা না যায় তাহলে তার কিছু বিধান রয়েছে ইসলামে।
ছেলে এবং মেয়ে হিসেবে মিরাস বা সম্পদের মাঝে যেটি কম হবে সেই অংশ মিরাস হিসেবে পাবে। অর্থাৎ তাকে ছেলে ধরলে যতটুকুু পায়, আর মেয়ে ধরলে যতটুক পায়, এর মাঝে যেটা ধরলে কম পায়, সেই হিসেবে তাকে মিরাস সম্পদ দেয়া হবে। (বাহরুর রায়েক ৮-৫৪৩)
ইসলাম অনুযায়ী হিজড়াদের মৃত্যুর পর গোসলের বিধান
হিজড়াদের মৃত্যুর পর কোনো নারী-পুরুষ তাদেরকে গোসল দিবে না; বরং তায়াম্মুম করিয়ে দিবে। এক্ষেত্রে যে তায়াম্মুম করাবে সে যদি হিজড়ার মাহরাম না হয় তাহলে হাতে কোনো কাপড় পেচিয়ে নিবে। কারণ পুরুষের জন্য কোনো নারীকে এবং নারীর জন্য কোনো পুরুষকে গোসল দেয়া শরীয়ত সম্মত নয়।
একজন মুসলিম হিসাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জানাযার নামায পড়া হবে এবং তাকে নারীদের ন্যায় পাঁচ কাপড়ে কাফন পরানো হবে। কেননা সে যদি নারীদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তো সুন্নাত সম্মত পন্থায় কাফন পরানো হলো। আর যদি পুরুষের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলেও কোনো অসুবিধা নেই। কারণ পুরুষ তার জীবদ্দশায় তিনের অধিক কাপড়ও পরিধান করে।
দাফনের সময় মাহরাম ব্যক্তিই তাকে কবরে নামাবে এবং চাদর ইত্যাদি দ্বারা তার কবরকে ঢেকে নিবে, এটা উত্তম এবং মুস্তাহাব। কেননা সে যদি প্রকৃতপক্ষে নারীর অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তো তা ওয়াজিবের পর্যায়ভুক্ত।
(ফতওয়ায়ে শামী ১০/৪৫০, কামসূল ফিকহ ৩/৩৭৯)
