লুকা হেইনঃ লিঙ্গবিকৃতির বলি
মিনেসোটার ২১ বছর বয়সী এক তরুণী লুকা হেইন।
এ বয়সের সহজাত তারুণ্যে উচ্ছ্বল আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো হতে পারতো তার জীবনটাও। কিন্তু জীবন তার থমকে গেছে অনেক আগেই, যখন সে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অস্ত্রোপচার করে তার দুটি স্তনই ফেলে দিয়ে রুপান্তরিত পুরুষ সেজেছিল। এখন সে তার হারানো নারীত্ব ফিরে পাবার জন্য সংগ্রাম করছে। আর এ সবকিছুর জন্য সে সম্পূর্ণরুপে দায়ী করেছে সংশ্লিস্ট চিকিৎসকদের। মামলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে। নেব্রাস্কার ডগলাস কাউন্টির জেলা আদালতে দায়ের করা ২৮ পৃষ্ঠার অভিযোগে স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা চিকিৎসক ডাঃ নাহিয়া আমৌরা, জেন্ডার ক্লিনিকের “affirming therapist” বা “নিশ্চিতকারী থেরাপিস্ট” মেগান স্মিথ-স্যালনস, “স্তন অপসারণ অস্ত্রোপচার” করা ডাঃ পেরি জনসন এবং অস্ত্রোপচারে সহায়তা করা ডাঃ স্টিফেন ব্যারিএন্টসকে বিবাদী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। মামলাটি দাবি করে যে তারা প্রত্যেকেই চিকিৎসায় অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত কারণ তারা লুকার নিজেই নিজের রোগ ডায়াগনোসিস করা নিয়ে প্রশ্ন না করে বরং তাকে অপরিবর্তনীয় রাসায়নিক এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ রূপান্তরের দিকে ধাবিত করেছিল।
মামলার তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে লুকার বয়স যখন ১৩ বছর তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। লুকা তখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক বিধায় কাস্টডির নিয়ম অনুযায়ী লুকাকে দুই বাসাতেই নির্দিষ্ট সময়কাল ধরে থাকতে হতো। ছোট্ট লুকার সময় দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়, বাবা মা দুজনকে একসাথে কাছে না পাওয়া সেইসাথে দুজনের বাসায় আলাদা করে দৌড়াদৌড়ি ভীষণ প্রভাব ফেলে লুকার শিশুমনে। ফলে স্কুলে রেজাল্ট খারাপ করতে থাকে লুকা এবং বিষণ্ণতা ও আতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়। তার ক্ষুধামন্দা হয়, নিজের ক্ষতি করা শুরু করে এবং অন্যদের সাথে আত্মহত্যা বিষয়ে আলোচনা করতে থাকে। পরবর্তী বছরগুলোতে বেশ অনেকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য।
এরপর নিঃসঙ্গ লুকা অনলাইনে সান্ত্বনা খুঁজে ফেরে। সময়টা ২০১৭ সাল। অনলাইন পোর্টালে আমেরিকার বাইরে বসবাসকারী একজন বয়স্ক ব্যক্তির সাথে লুকার সখ্যতা গড়ে ওঠে। লুকার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে লোকটি তাকে বাধ্য করে যৌন আপত্তিকর ছবি পাঠাতে। লুকা অস্বীকৃতি জানালে তাকে হুমকি দেয়। নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে সে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারীদের সাথে যোগাযোগ করে। সেখানে ঘটনা সম্পর্কে বারবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় যা মানসিকভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলে লুকার। এদিকে বয়ঃসন্ধিকালের শুরু থেকেই লুকা তার ক্রমবর্ধমান স্তন এবং ঋতুস্রাব নিয়ে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করতো। সেইসাথে অনলাইনের এই বিরূপ অভিজ্ঞতায় লুকার মনে ভাবনা আসে, তার স্তন না থাকলেই হয়তো ভাল হতো। এই ভাবনা থেকে অনলাইনে সে জেন্ডার আইডেন্টিটি বিষয়ে খুঁজতে থাকে যা তাকে ট্রান্স ইনফ্লুয়েন্সার বা লিঙ্গ বিকৃতিকারকদের অনুসরণ করতে শুরু করায়। তারা স্তন ফেলে দেওয়ার অস্ত্রোপচার বা ডাবল ম্যাস্টেকটমি সার্জারি ও হরমোন পরিবর্তনের থেরাপির গুণগান করে এবং তারা লুকাকে বুঝতে বাধ্য করে যে সে ভুল লিঙ্গে আটকে আছে। ফলে লুকা নিজেকে মনে মনে পুরুষ ভাবতে শুরু করে, অনলাইনে একটি চেস্ট বাইন্ডার অর্ডার করে যা তার বুক বেঁধে রেখে সমান দেখাতে সাহায্য করবে, মেয়েদের স্কুল থেকে ট্রান্সফার হয়ে অন্য স্কুলে চলে যায় এবং নিজের নামটিও বদলে ফেলে।
অনলাইন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী লুকা ভাবে তার স্তন কেটে ফেলে দিলে হয়তো তার মানসিক অস্থিরতা সেরে যাবে, সেই মোতাবেক ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টারের কর্মীদের সাথে দেখা করে। সেখানকার চিকিৎসকেরা কোনো বিশদ মূল্যায়ন ছাড়াই মাত্র ৫৫ মিনিটের প্রথম সেশনেই তড়িৎ ডায়াগনোসিস করে লুকার জেন্ডার আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার (GID) বা লিঙ্গ বিভ্রান্তি রয়েছে বলে, যা ভুল। মামলাটি যুক্তি দেয় যে, রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই দ্রুততা সঠিকভাবে রোগ ডায়াগনোসিস এর পরিপন্থী যা লুকার মতো রোগীদেরকে লিঙ্গ রূপান্তরের আরও গভীর ও ক্ষতিকারক পর্যায়ে ঠেলে দেয়।
সে বছরের অক্টোবরেই, লুকার মানসিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করার পরিবর্তে স্মিথ-স্যালনস ডাবল ম্যাস্টেক্টমির জন্য লুকাকে জেন্ডার ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেন। তখন লুকা অস্ত্রোপচারের বিকল্প নিয়ে আলোচনা করার জন্য ডাঃ জনসন এবং ডাঃ আমৌরার সাথে দেখা করে, কিন্তু সরকারী মেডিকেল রেকর্ডে ডাঃ আমৌরা লিখেন যে লুকা একটি “এন্ডোক্রাইন বা হরমোনাল ব্যাধি”র জন্য দেখা করেছে, যা ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া তথ্য কারণ লুকার এন্ডোক্রাইন সিস্টেম একদম সুস্থভাবে কাজ করছিল।
মামলাটি দাবি করে, একটি মানসিক অসুস্থতার ‘চিকিৎসা’ করার জন্য লুকার সুস্থ এন্ডোক্রাইন সিস্টেমকে ব্যাহত করার যে পরিকল্পনা আসামী ডাঃ আমৌরা করেছিলেন তা একদমই যুক্তিসঙ্গত নয়। সেইসাথে চিকিৎসকদের উচিত ছিল লুকার অতীত ইতিহাসের সমস্ত রেড ফ্ল্যাগ চিহ্নিত মানসিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। একজন বিচক্ষণ প্লাস্টিক সার্জনের কখনোই উচিত হয়নি এমন মানসিক অবস্থার এক কিশোরীর উপর এত বড় অপারেশন করে ফেলা। বরং তিনি লুকার বাবা-মাকে উল্টো বুঝিয়েছিলেন এই সার্জারি করতে না দিলে লুকা আত্মহত্যা করবে, যদিও সেসময় আত্মহত্যার চিন্তা লুকার মাথাতেও আসেনি। শেষ পর্যন্ত ২৬ জুলাই, ২০১৮তে লুকার সেই চিরস্থায়ী স্তন অপসারণ সার্জারি করা হয়, যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর এবং আইনত “সম্মতি দিতে অক্ষম” ছিল সে।
পরবর্তী ৪ বছর লুকা টেস্টোস্টেরন বা পুরুষ হরমোন থেরাপি গ্রহণ করে। ডাঃ আমৌরা তাকে পরামর্শ দেয় হিস্টেরেকটমি বা স্থায়ীভাবে তার জরায়ু পুরোটা ফেলে দিতে, কিন্তু লুকার বাবা-মা আপত্তি জানায় তাই তা আর করা হয়না।
অপারেশনের পরে লুকা অস্থিসন্ধি, লাম্বার স্পাইন বা কটিদেশীয় মেরুদণ্ড, হাত, কব্জি, কনুই ও পেলভিক বা কোমরের ব্যথায় ভুগছিল এবং টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাবে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়ায় অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। প্রতিটা দিন লুকার ঘুম ভাঙতো অসহনীয় ব্যথা নিয়ে। যখন সে সিদ্ধান্ত নিল এ চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার, ততোদিনে লুকার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে অনেক দিন সে কোন কাজ করতে পারেনি বা বিছানা থেকেও উঠতে পারেনি। অবশেষে লুকা জানুয়ারিতে ডাঃ আমৌরাকে জানায় যে সে ডি-ট্রানজিশন করছে, কিন্তু আমৌরা তাকে উল্টো মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ নিতে বলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডেইলি মেইলকে লুকা বলে, “আমি আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার এবং সবচেয়ে বিশৃঙ্খল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম এবং আমার প্রয়োজনীয় সাহায্য পাওয়ার পরিবর্তে, এই চিকিৎসকরা এই দুঃস্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছে।”
সে আরও যোগ করে যে অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসায় সম্মতি দেওয়া তার উচিত হয়নি, কারণ সে তখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল। সে বলে, “আমি মনে করি যে বাচ্চারা এত অল্প বয়সেই তাদের সম্পূর্ণ শারীরিক বিকাশ হওয়ার আগেই তা কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে মত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। আমাকে এমন সব চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয় বলা হয়েছিল যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং পরিণতিগুলি আমি পুরোপুরি বুঝতেই পারি না।”
লুকা এখন মেডিকেল সেন্টারের কাছ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকদের কাছে জবাবদিহিতা চেয়েছে। সে আবারও সুস্থ স্বাভাবিক নারীর সমস্ত সত্বা নিয়ে বাঁচতে চায়। যদিও সে জানে স্তন ফেলে দেওয়ায় তার কখনো মাতৃত্বের স্বাদ পূর্ণভাবে নেওয়া হবেনা।
তথ্যসূত্র:
https://nypost.com/2023/09/14/woman-who-transitioned-at-16-sues-doctors-over-double-mastectomy
