সেইজ লিলি ব্লেয়ার। বয়স দুই হবার আগেই ছয় ছয়টা পালক পরিবারে হাতবদল হতে হয় অনাথ মেয়েটার। শেষমেষ ঠাই মেলে দাদাদাদীর ঘরে। অ্যামেরিকার দক্ষিনে পাহাড়ঘেরা ভার্জিনিয়ার সবুজ ঘাসের গালিচা বেছানো ছোট্ট এক শহরে। বুড়োবুড়ির কাছেই ভালোই বেড়ে উঠছিল সেইজ। ভালো ছাত্রী ছিল ও, অবসরে কবিতা লিখতে আর পিয়ানো বাজাতে ভালোবাতো।
তবে আরেকটা দিক ছিল ওর জীবনের। ছোটবেলা থেকেই নানা মানসিক সমস্যা তাড়া করে বেড়াতো ওকে – ডিপ্রেশন, সেলফ হার্ম, ইটিং ডিসঅর্ডার, অনেক সময় হ্যালুসিনেশন। জ্ঞান হবার আগেই দেখে ফেলা জীবনের নিষ্ঠুর চেহারাটা হয়তো গভীর ক্ষত একে দিয়েছিল ওর মনে।
সেইজ ছিল বুদ্ধিমান কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর। কাঁচের জিনিসপত্রের প্যাকেটে লেখা থাকে না ‘হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার’? কথাটা ওর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
সেইজ যখন ক্লাস এইটে পড়ে, তখন একদিন বাড়ি ফিরে দাদীকে ও বললো, সব মেয়েই নাকি স*ক।মI, উ*ক।মI অথবা ট্র্যান্সফর্মার হয়। স্কুলে টিচার আর বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে ও।
কথাগুলো কতোটুকু বুঝলো কে জানে, তবে পরের বছর থেকে স্কুলে নিজেকে ছেলে বলে পরিচয় দেয়া শুরু করলো সেইজ। বললো, এখন থেকে ওর নাম ‘ড্র্যাইকো’। নামটা সম্ভবত হ্যারি পটারের বই বা কোন কমিক বুক থেকে বাছাই করা। ব্যাপারটা বাড়িতে ও জানালো না।
স্কুল কর্তৃপক্ষ বিনা প্রশ্নে ওর কথা মেনে নিল। ক্লাসের খাতাপত্রে ওর নাম পালটে ড্র্যাইকো লেখা হল। এ নামেই ওকে ডাকতে শুরু করলো টিচাররা। স্কুলের কাউন্সেলর বুদ্ধি দিলো, ওর উচিৎ এখন থেকে ছেলেদের টয়লেট ব্যবহার করা। স্কুল থেকে একবারও ওর দাদাদাদীকে জানালো হল না ব্যাপারটা।
অ্যামেরিকার হাইস্কুলগুলোতে অনেকেই প্রচণ্ড বুলিয়িং এর শিকার হয়। ব্যাপারটা তাদের সাথে বেশি ঘটে যারা একটু লাজুক, একটু অমিশুক। সেইজের ক্ষেত্রে তাই ঘটলো। চরম বুলিয়িং এর মুখোমুখি হল ও।
ছেলেদের বাথরুমে ভয়ংকর গালিগালাজ শুনলো, অনেকে গায়ে হাতে দিল। একদিন কয়েকজন ওকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে শাসালো, আবার তোকে এখানে দেখলে রেই* করবো।
পরে সেইজ জানাবে, ছেলেদের টয়লেটে যাবার কোন ইচ্ছেই ছিল না ওর। ব্যাপারটা নিয়ে ওর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক কাজ করতো। কিন্তু স্কুল কাউন্সেলর বারবার জোর দিয়ে বলছিল, ‘ড্র্যাইকো’ যেহেতু ছেলে তাই ওর উচিৎ ছেলেদের টয়লেটই ব্যবহার করা ।
গালিগালাজ, হুমকি, আর তীব্র আতংক খুব বেশিদিন নিতে পারলো না সেইজ। বাড়ি থেকে পালালো ও। পালানোর পরিকল্পনা করলো অনলাইনে পরিচয় হওয়া এক বন্ধুর সাথে মিলে। ছেলেটার বয়স ষোল। সেইজের মতো সে-ও নাকি স্কেইটবোর্ডিং ভালোবাসে। পালাবার বুদ্ধিটা প্রথম তার মাথাতেই এসেছিল।
বন্ধুর ওপর ভরসা করে ২০২১ এর অগাস্টের ২৫ তারিখ রাতে ঘর ছাড়লো সেইজ। শুরু হল ছয় মাসের এক বীভৎস দুঃস্বপ্ন। ওর বয়স তখন ১৪।
সেইজের বন্ধু মিথ্যা বলেছিল। তার বয়স আসলে ষোল না, ছিল ছত্রিশ। লোকটার আসল কেনেথ ফিশার। যৌ* নির্যাতনজনিত অপরাধে জেল খাটা আসামী।
সেইজকে কিডন্যাপ করে প্রথমে ওয়াশিংটন তারপর বাল্টিমোরের মেরিল্যান্ডে নিয়ে গেল ফিশার। জায়গাটা ভার্জিনিয়া থেকে দুশো দশ মাইল দূরে। একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে প্রথমে সেইজকে ধর্ষ* করলো ফিশার। তারপর টাকার বিনিময়ে ওকে তুলে দিল আরও অনেকের কাছে। উপুর্যপরি ধ–ন ও গণ ধ–র শিকার হল সেইজ।
অপহরণের এক সপ্তাহ পর কেনেথ ফিশারের বাড়ির তালাবদ্ধ রূম থেকে সেইজকে উদ্ধার করলো এফবিআই। দুঃস্বপ্নটা এখানে শেষ হবার কথা ছিল। এখানেই শেষ হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হলো না।
সেইজকে খুঁজে পাওয়া গেছে জানার পর দুশ্চিন্তায় পাগল হতে বসা দাদাদাদী সারা রাত গাড়ি চালিয়ে মেরিল্যান্ড এসে পৌছলো। কিন্তু ওকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার বদলে উল্টো দুজনকে তলব করা হল কোর্টে। সেখানে তারা জানতে পারলেন মেরিল্যান্ড নগর কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের মামলা করেছে।
কর্তৃপক্ষে ধারণা দাদাদাদীর নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতেই বাড়ি থেকে পালিয়েছে সেইজ। ওকে তাদের কাস্টডিতে দেয়া হবে না। আপাতত রাখা হবে একটা কিশোর সংশোধনাগারে।
কোর্টে বিস্ফোরিত চোখে সেইজের দাদী শুনলেন, তার পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা, ৪৫ কেজি ওজনের, সবে মাত্র ভয়ঙ্কর নির্যাতনের কবল থেকে উদ্ধার পাওয়া নাতনীকে কিশোর অপরাধীদের সাথে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিচারক। কারণ ও বলেছে ওর নাম ‘ড্র্যাইকো’, নিজেকে ও একজন ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
কিশোর সংশোধনাগারে আবারও ধ-ত হল সেইজ। পরিচয় হলো ড্রাগসের সাথেও। দু মাস এখানে কাটাবার পর নভেম্বরের ১২ তারিখ ভীতস্বন্ত্রস্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সেইজ আবারও পালালো। এবং আবারও কিডন্যাপড হলো।
এইবার অপহরণের পর মেরিল্যান্ড থেকে টেক্সাসের ডালাসে নিয়ে গেল ওকে অপহরণকারী। একটা বদ্ধ রুমে না খাইয়ে রাখলো দিনের পর দিন, পেটালো। নেশাগ্রস্থ করে প–গ্রাফি বানালো ওকে দিয়ে, ওর শরীর বিক্রি করলো।
এমন অবস্থা থেকে অনেকেই আর ফিরে আসে না। খোজ পাওয়া যায় না তাদের। তবে সেইজকে খুঁজে পাওয়া গেল। দ্বিতীয়বার অপহৃত হবার আড়াই মাস পর টেক্সাসের মার্শালরা ওকে উদ্ধার করলো।
সেইজ এখন একটা মানসিক হাসপাতালে রোগী। এখানেই কাটাতে হবে আগামী এক থেকে দুই বছর। তীব্র ট্রমা আর পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসর্ডারের ভুগছে ও।
