Prisha Mosley
“নারীত্ব কী জিনিস তা অনুভব করার আগেই আমি নারী হওয়াকে অনিরাপদ ভাবতে শুরু করি। আমি এমন একটা বিষয়ে ভয় পাচ্ছিলাম যা আমি কখনো আস্বাদনই করিনি। এখন পরিস্থিতি এমন যে, আমার পক্ষে হয়ত একজন পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠা সম্ভব নয় এবং আমার পক্ষে হয়ত জানাও সম্ভব নয় নারীত্বের অনুভূতি কেমন হয়!” দ্য পোস্ট সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে প্রিশা মোসলের এমন বক্তব্যই শোনা যায়।
মেরিল্যান্ড এবং উত্তর ক্যারোলিনায় বেড়ে উঠার সময় প্রিশা প্রচন্ড মানসিক ডিসট্রেসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলো।
১২-১৩ বছর বয়সে, প্রিশার ডিসট্রেস দেখা দিতে শুরু করে। সে তার পরিবারের সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পারছিলো না। বারবার হওয়া অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশনের কারণে তার মধ্যে না খেয়ে থাকার প্রবণতা শুরু হয় এবং আত্মঘাতী চিন্তা লালিত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে ডায়াগনসিস করে প্রিশার মধ্যে Anorexia ও বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার পাওয়া যায়।
প্রিশা নিজেকে এবং নিজের শরীরকে প্রচন্ড ঘৃণা করতে থাকে। সিভিয়ার Anorexia র জন্য প্রিশাকে একবার হসপিটালাইজও হতে হয়েছে।
প্রিশা তার মানসিক সমস্যারগুলোর জন্য সমবয়সী কারো সাথে বন্ধুত্ব করে পারছিলো না। ফলে একটু প্রশান্তির আশায় ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকলেন ।
১৫ বছর বয়সে ইন্টারনেটে প্রথমবারের মতো ট্রান্সজেন্ডারিজম নিয়ে জানতে শুরু করে।
তিনি অনলাইনে একটি ট্রান্সজেন্ডার একটিভিস্ট কমিউনিটির সন্ধানও পান।
IWF এ দেয়া সাক্ষাতকারে প্রিশা ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির ভালোবাসা এবং কেয়ারকে “লাভ বম্বিং” হিসেবে অবহিত করেন। কেননা তারা তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল সে যেহেতু নিজেকে এবং নিজের শরীরকে ঘৃণা করছে তাই সে ভুল শরীরে জন্ম নিয়েছেন ।
বয়ঃসন্ধিকালের প্রারম্ভকালেই প্রিশার মধ্যে প্রায়ই জেন্ডার ডিসফোরিয়ার অনসেট দেখা দিতে শুরু করে।
সাধারনত মনে মনে নিজেকে ক্রস-জেন্ডার মনে করা কিংবা ভুল শরীরে আটকে পড়েছি এই ধরনের চিন্তা ৬ মাস বা এর অধিক স্থায়ী হয়ে জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করলে সেটা জেন্ডার ডিসফোরিয়া নামক মানসিক সমস্যা হসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রিশা নিজের মেয়েলী বৈশিষ্ট্যগুলো ঘৃণার চোখে দেখতো।
কখনো সত্যিকারের মেয়ে হয়ে, কখনো টমবয়ের মতো, কখনো অন্য মেয়েদের মতো হয়ে প্রিশা সময় কাটাতে থাকে কিন্তু সে কিছুতেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলো না। ফলে সে ভাবতে শুরু করে আমি হয়ত মেয়েই নই।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ২০ বছর বয়সী পুরনো বন্ধুর বন্ধু দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর তার এই অনুভুতিটি তীব্র আকার ধারণ করে।
দুঃখজনকভাবে এই যৌন নির্যাতন তাকে তার নারীত্বকে অস্বীকার করতে প্রভাবিত করে।
সে ভেবেছিলো যৌন নির্যাতনের শিকার কেবলমাত্র নারীরাই হয় এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার জীবনে ট্রানজিশনের আবির্ভাব ঘটে।
ট্রান্স কমিনিটির সহানুভূতি সমর্থন পাওয়ার পর প্রিশা ১৫ বছর বয়সে সামাজিকভাবে নিজেকে ছেলে হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।
প্রিশার মা তার এই সামাজিক ট্রানজিশনেরও বিরুদ্ধে ছিলো।
প্রথমদিকে ছেলে হিসেবে সমাজে নিজেকে উপস্থাপন করার নতুন অভিজ্ঞতা প্রিশাকে চমৎকার অনুভূতি দেয় বিশেষত যখন সে তার অনলাইন বন্ধুদের ব্যাপক উৎসাহ পাচ্ছিলো।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে, প্রিশা অনলাইন জগতে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে। এটি তাকে সাময়িক ভালোলাগার অনুভূতি দেয় এবং তার মধ্যে বারবার এমন অনুভূতি পাওয়ার ইচ্ছা তীব্র হতে থাকে।
অনলাইন একটিভিস্টরা প্রিশাকে একজন ট্রান্সজেন্ডার বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করতে সাহায্য করেছিলো। বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে প্রিশা ও তার মা-বাবা তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। সেশনটি এক ঘন্টারও কম সময় স্থায়ী হয়েছিল।
প্রিশার জন্য বিশেষজ্ঞের সাক্ষাত করা স্বস্তির ছিল।
কারণ তিনি প্রিশার চোখের দিকে তাকিয়ে তাকে বলেছিলেন “তুমি একটা ছেলে”।
অন্যদিকে প্রিশার মা-বাবার জন্য অভিজ্ঞতাটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ছিলো।
প্রিশার ভাষায় সেদিন তার মা-বাবাকে রীতিমতো বুলি করা হয়েছিল।
ট্রান্সজেন্ডার বিশেষজ্ঞ প্রিশার মা-বাবাকে বলছিলো, আপনারা একজন মৃত কন্যা দেখতে চান নাকি একজন জীবিত পুত্র চান? আপনার মেয়ের বডি কোনো মর্গ থেকে গ্রহণ করতে চান নাকি তার শরীরের জন্য হরমোন নিতে চান? তাদেরকে মানসিকভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়েছিল।
প্রথম সেশন শেষেই বিশেষজ্ঞ প্রিশাকে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি এবং সার্জারি সাজেস্ট করে দেন।
অথচ প্রিশা কিশোরী বয়স থেকেই ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, সেল্ফ হার্ম ও আত্মহননের মতো চিন্তার সাথে যুদ্ধ করেছে। এমনি গুরুতর মাত্রার Anorexia -র জন্য সে ইতিমধ্যে একজনের পুষ্টিবিদের চিকিৎসাও নিয়েছে। সর্বোপরি প্রিশা বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছিলো।
প্রিশা অন্যতম নথিভুক্ত মানসিকভাবে অসুস্থ শিশু ছিলেন।
এতো কিছু জানার পরও ডাক্তার মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে প্রিশাকে টেস্টোস্টেরন এর ট্রিটমেন্ট দেয়া শুরু করে।
১৮ বছর বয়সে প্রিশা বুকের অবয়ব পুরুষালি করার জন্য ডাবল ম্যাস্টেক্টমি করে তার সুস্থ স্বাভাবিক স্তন অপসারণ করেন।
প্রিশা নিজেকে ভুল শরীরে জন্মগ্রহণ করা একজন ছেলে মনে করছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এই ওষুধ আর সার্জারিই তার প্রয়োজন ছিলো। এগুলো পূর্বে না পাওয়ার কারণেই হয়ত তিনি আত্মঘাতী হয়ে উঠেছিলেন।
অস্ত্রোপচারের পর প্রিশাকে ফ্লোরিডায় তার অনলাইন বন্ধুদের সাথে থাকার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। তাকে বলা হয়েছিলো যে সে তার রক্ষণশীল ক্রিস্টিয়ান পরিবারের কাছে এই অবস্থায় অনিরাপদ।
প্রিশা মানসিকভাবে এতোটাই আনস্টেবল ছিলো যে তার ডাক্তার একবার তাকে জিজ্ঞেস করেন বর্তমান প্রেসিডেন্টের নাম কি? কারণ সে বাস্তবতা থেকে বহু দূরে এক ভিন্ন জগতে বাস করছিলো। এই আনস্টেবল অবস্থায় তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যেটা তার পুরো জীবনকেই বাজেভাবে বদলে দিয়েছে।
কিন্তু লম্বা একটা সময় পর্যন্ত প্রিশা এটা স্বীকার করত না যে, সে ভুল কিছু করেছে। কারণ সে প্রচুর টাকা এবং সময় এর পিছনে খরচ করেছেন। নিজের পরিবার থেকেও দূরে চলে গিয়েছেন।
প্রিশা সাইকোথেরাপির মাধ্যমে অন্যান্য মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় তিন বছর ধরে তার অনলাইন বন্ধুদের সাথেই বসবাস করে আসছিলেন।
Dialectical Behavioral Therapy প্রিশার বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। ফলে সে তার আত্মঘাতী চিন্তা থেকেও বের হয়ে এসেছিল। অথচ সে তার বডিকে ট্রানজিশন প্রক্রিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের আশায়।
প্রিশার অন্তর্নিহিত মানসিক সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে প্রশমিত হওয়ার পর তিনি অনুধাবন করেন ট্রানজিশন তাকে তার মানসিক সমস্যা দূর করতে কোনো প্রকার সাহায্য তো করেইনি উল্টো আরও মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে গিয়েছিল।
তিনি অনুশোচনাবোধ করতে থাকেন এই ভেবে যে, তিনি নিজের শরীরের বিকৃতি না ঘটিয়েই আত্মঘাতী চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে পারতেন!
প্রিশা ডি-ট্রানজিশনের পথে হাটতে শুরু করেন এবং হরমোন গ্রহণ বন্ধ করে দেন।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওমেনস ফোরামে(IWF) দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রিশা বলেন, মেন্টাল হেলথ ট্রিটমেন্টের জন্য শারীরিক কোনো পরিবর্তন কোনো সমাধান হতে পারে না। তিনি আরও বলেন Liposuction, Anorexia -র কোনো ট্রিটমেন্ট নয় কিন্তু সার্জারীকে ঠিকই জেন্ডার ডিসফোরিয়ার ট্রিটমেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
প্রিশা তার মানসিক সমস্যার সঠিক সমাধান পেয়ে যান, যেই সমাধানের খোঁজে নিজের দেহকে ট্রান্সজেন্ডার বিশেষজ্ঞদের এক্সপেরিমেন্টাল অবজেক্ট বানাতে হয়েছিল।
ট্রান্স কমিউনিটির বলা মিথ্যাগুলোও পরবর্তীতে সে বুঝতে পারে। যেই কথার মাধ্যমে তাকে প্রভাবিত করে তার পরিবার থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল।
IWF এ দেয়া ইন্টারভিউতে প্রিশা আরও বলেন, “ট্রান্স কমিউনিটি সব সময় বলত নিজের পুরাতন ভার্সনকে হত্যা করে ফেলো, নিজের পূর্বের নাম পরিচয় ভুলে যাও। আর আমি সত্যিই এখন অনুভব করি যে, আমি একজন শিশুকে হত্যা করেছি, যেটা ছিলাম আমি।”
প্রিশা ২৫ বছর বয়সে ট্রান্স পরিচয় থেকে পুনরায় নিজের জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ে ফিরে আসেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে মেডিকেল প্রফেশনালদের পরামর্শে টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন এবং ডাবল মেস্টেক্টমির করানোর মাধ্যমে যিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে গিয়েছিলেন।
প্রিশা বলেন, তিনি টান্স একটিভিস্ট এবং থেরাপিস্টের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ট্রান্সজিশনের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন। অথচ তার মূল সমস্যা ছিলো মানসিক। তিনি নিজেকে ভুল শরীরে আটকে পড়া ছেলে মনে করতেন অর্থাৎ তার জেন্ডার ডিসফোরিয়া ডেভেলপ হয়েছিল।
প্রিশা মনে করেন কারো বয়স ২৫ হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ মস্তিষ্ক পুরোপুরি সুগঠিত না হওয়া পর্যন্ত নিজের শরীরে হরমোন থেরাপি কিংবা সার্জিক্যাল ট্রিটমেন্টের মতো এক্সপেরিমেন্ট করার অনুমতিই দেয়া উচিত না।
প্রিশা সবকিছু ভুলে তার নতুন জীবন শুরু করেছেন, কিন্তু পুরনো ক্ষতগুলো এখনো তার পিছু ছাড়েনি।
টেস্টোস্টেরন গ্রহণের প্রভাবে প্রিশা এখনো ভোকাল কর্ডের ব্যথায় ভুগেন, যার ফলে তার একসময় কথা বলতেও কষ্ট হতো। টেস্টোস্টেরন গ্রহণের ফলে তার কাঁধও চওড়া হয়ে গিয়েছে। গুরুতর পর্যায়ের ভ্যাজাইনাল অ্যাট্রোফিতেও ভুগছেন তিনি।
ম্যাস্টেক্টমির কারণে সে কখনোই নিজের সন্তানকে ব্রেস্টফিডিং করাতে পারবে না। যদিও প্রিশা জানে না তিনি এখনো সন্তান জন্মদানে সক্ষম কি না।
বর্তমানে প্রিশা তার পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারছেন। তিনি ফেরিস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন এবং একজন থেরাপিস্ট হওয়ার জন্য পড়াশোনা করে যাচ্ছেন, যাতে তিনি তার মতোই মানসিক সমস্যার সাথে সংগ্রাম করা মানুষদের সাহায্য করতে পারেন।
তথ্যসূত্র :
Why teen girl who became a trans man is now a woman again
Identity Crisis: Detransitioner Betrayed by Health Professionals Who left Her Mutilated
